ঢাকা রাত ১১:৩৩, শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২০ ইং, ১৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বাজেট ২০২০-২১

বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

সাধারন জীবনে কোনো কিছু কিনতে গেলে সেটা কেনার অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা সেই জিনিসটি কেনার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থকে আমরা বাজেট বলি। দাম দরে না মিললে বলে দিই বাজেট নাই। আর জাতীয় জীবনে বাজেট হচ্ছে একটি দেশের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব। সরকারকে দেশ চালাতে হয়, সরকারের হয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের বেতন দিতে হয়, আবার নাগরিকদের উন্নয়নের জন্য রাস্তাঘাট বানানোসহ কল্যাণমূলক সব ধরনের কাজ সারতে হয়। একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে কোথায় কত ব্যয় হবে, আর সেই ব্যয়ের টাকা কোত্থেকে আসবে সেই পরিকল্পনার নামই বাজেট।

বাজেটের আবার রকম আছে। আয় আর ব্যয় সমান না হলে সেটিকে অসম বাজেট বলে। অসম বাজেট আবার দুই রকম উদ্বৃত্ত বাজেট ও ঘাটতি বাজেট। ব্যয়ের তুলনায় আয় বেশি হলে সেটি উদ্বৃত্ত বাজেট। ঘাটতি বাজেট হচ্ছে ঠিক উল্টোটা। এখানে ব্যয় বেশি, আয় কম। আর যে বাজেটে আয় ও ব্যয় সমান থাকে সেটিকে বলে সুষম বাজেট। উন্নত দেশগুলো সাধারণত সুষম বাজেট করে থাকে। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে সব সময়ই সুষম বাজেট প্রণয়ন সম্ভব হয় না। উন্নয়নশীল দেশগুলো সাধারণত ঘাটতি বাজেটই করে থাকে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য মতে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বরং ঘাটতি বাজেটই উত্তম। এতে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে, ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে। তাতে অর্থনীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। যেসব রাষ্ট্র ঘাটতি বাজেট পরিকল্পনা করে তাদের জন্য সেটি বাস্তবায়ন বরাবরের জন্যই চ্যালেঞ্জের হয়ে থাকে। এবারের বাজেট ২০২০-২১ এমন একটি সময়ে ঘোষিত হলো যখন গোটা বিশ্ব লড়ছে এক মরণ ব্যাধির সঙ্গে। বৈশ্বিক অর্থনীতি নিশ্চিতভাবেই মুখ থুবড়ে পড়ার মুখে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অবস্থাও তেমনই। এই বাজেট নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছে, তখন প্রতিদিনই ভাঙছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড। তাই অনেকগুলো অনিশ্চয়তা, অনেকগুলো অনুমাননির্ভর সূচক ধরে ধরে প্রণীত হয়েছে এবারের বাজেট। আর এ কারনেই অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের বাজেট বাস্তবায়নটাকে বড় চ্যালেঞ্জ বলা হচ্ছে।
করোনাকালের বহুল আলোচিত এ বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সংক্ষিপ্ত পরিসরে উত্থাপিত হলেও এটি হচ্ছে দেশের ৪৯ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। আর বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন ‘যে অমানিশার অন্ধকার আমাদের চারপাশকে ঘিরে ধরেছে, তা একদিন কেটে যাবেই। এই বাজেটের হাত ধরেই আমরা অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে আগের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ভিত রচনা করব।’ এর পেছনে মূল কারন হচ্ছে এ বাজেটে মাননীয় অর্থমন্ত্রী ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। সব মিলিয়ে বাজেটের আকার হচ্ছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।
এবার তাকানো যাক আয়ের দিকে। বিপুল এ এই ব্যয় মেটাতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ ৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের ঘাটতি থাকবে (অনুদানসহ) ১ লাখ ৮৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা।
গত এক দশক ধরে বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির যে প্রবণতা আমরা দেখে এসেছি, করোনা পরিস্থিতিতেও তা অব্যাহত থাকতে দেখলাম। গত বছর জুন মাসে তিনি যখন অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বাজেট পেশ করেন, তখন উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেখে কেউ কেউ সেটাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ আখ্যা দিয়েছিল। এবার করোনা পরিস্থিতিতেও প্রবৃদ্ধির একই লক্ষ্যমাত্রা নিশ্চয়ই সরকারের সদিচ্ছা ও সাহসেরই প্রমাণ।
বরাবরের মতো রাজস্ব আদায়েও রাখা হয়েছে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা। অনেকেই যে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তা উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। বিশেষত করোনা পরিস্থিতিতে যেখানে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক অর্থকরী প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিকভাবেই প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করছে, সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কতটা ‘সময়োচিত’ সেটা নিয়ে তর্ক হতেই পারে। আবার সরকার এই বাজেটকে বলছেন মানুষ বাঁচানোর বাজেট। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মানুষকে বাঁচানোর জন্য এমন ঘাটকি বাজেট মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। সরকার নিশ্চয়ই তার লক্ষ্য পূরণে কোনো না কোনো ম্যাজিক দেখাবে। তবে সিপডির বক্তব্যে ওঠে এসেছে বাজেটের একটি দারুন চিত্র। গত বছর প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা বাজেট প্রণয়নকালে নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এর একটি কারণ হতে পারে অর্থবছরের শেষাংশজুড়ে করোনা অস্থিরতা। সেক্ষেত্রে আসন্ন অর্থবছরের শুরু থেকেই একই বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রবৃদ্ধি বা কর আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তি কী? যদিও বাজেট পেশের পরদিন শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য। বৃক্ষের পরিচয় আমরা ফলের মাধ্যমে দেখতে চাই। অর্থমন্ত্রী আরো বলেছেন এই বাজেট মানুষকে বাঁচানোর জন্য করা হয়েছে। এই বাজেটে উল্টো করা হয়েছে। আগে ব্যয়, পরে আয়।

দুর্যোগকালীন সময়ে আসলে অর্থমন্ত্রীরও করার কিছুই নেই। এখন গোটা বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করা আসলেই কঠিন। এবার বাজেট যে পরিস্থিতিতে প্রণয়ন ও ঘোষণা করতে হয়েছে, স্বাধীনতার পর তেমন পরিস্থিতি কখনও হয়নি। যেমন বৈশ্বিক, তেমনই অভ্যন্তরীণ প্রায় সব খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির। এই বাজেট যেখানে উদ্দীপকের ভূমিকা পালন করবে বলেই প্রত্যাশা।
বাজেটে অনেকগুলো বিষয় নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। অবশ্য এই বিষয়গুলো নিয়ে কম বেশি বাংলাদেশের সব বাজেটেই আলোচনা হয়ে থাকে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি আয়কর সীমা বাড়িয়ে দেওয়া, কালো টাকা সাদা করার পরিসর বৃদ্ধি, নতুন কর আরোপ না করা- এসবের মধ্য দিয়ে সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতা ও বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও নিম্নবিত্তদের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয়। কৃষিতে ভর্তুকি বর্তমান সরকার টানা তিন মেয়াদের প্রথম থেকেই দিয়ে আসছে। করোনা পরিস্থিতিতে তাতে আরও জোর দেওয়া সঙ্গত হয়েছে। আমরা দেখেছি, করোনা মোকাবিলায় বাজেট ঘোষণার আগেই প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন খাতের জন্য ঘোষণা করেছিলেন তাৎক্ষণিক প্রণোদনা প্যাকেজ। এর ছাপ আমরা দেখতে পাচ্ছি বাজেটেও। তবে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ। করোনাকালীন সময়ে আমরা দেখেছি আমাদের স্বাস্থ্যখাতের কী দুর্দশা। ফলে স্বাস্থ্য খাতেকে ঢেলে সাজানোর জোর দাবি ওঠেছে সর্বত্র। কিন্তু এবারের বাজেটে সে পরিমাণ বরাদ্দ নেই বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও অর্থমন্ত্রী বলছেন স্বাস্থ্যখাকে টাকার অভাব হবে না এরপরও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে মানুষ আরও বেশি বরাদ্দ ও স্পষ্টতর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দেখতে চেয়েছিল। আমরা আশা করবো সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন।
তবে বাজেট প্রণয়ণ বাস্তবায়নের মাঝখানে একটি জিনিসের গ্যারান্টি সবাই চাইবে। সেটি হচ্ছে সুশাসন। সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রের কল্যাণ থামিয়ে রাখা যায় না। কথার পিঠে কথার সমালোচনা নয়। প্রয়োজন দেশেপ্রেমে বলীয়ান হয়ে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করা। সেই সদিচ্ছা, সততা আর দেশের মানুষের জন্য ভালোবাসা থাকলে সব দুর্যোগ আর সব ঘাটতিকেই জয় করা সম্ভব।

  • মেহেদী হাসান বাবু, সম্পাদক ও প্রকাশক, আজকের বিজনেস বাংলাদেশ
এ বিভাগের আরও সংবাদ
//graizoah.com/afu.php?zoneid=3354715