ঢাকা রাত ১০:১২, শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২০ ইং, ১৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনা মোকাবেলায় সাবান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহার

সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে কিছু সময় পরপর দুথহাত খুব ভালো করে ধৌত করা করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এক অন্যতম পদক্ষেপ। গণমাধ্যমগুলোতেও এ বিষয়ে নিয়মিত প্রচারণা চলছে।

বলা হচ্ছে যে- সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে দুথহাত কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ভালোভাবে ধৌত করুন। কনজুমার প্রোডাক্ট সেফটি কমিশনের তথ্য মতে, সাবান হল প্রাণীজ ফ্যাট বা উদ্ভিদজ তৈল (যেমন- জলপাই, নারকেল বা পাম তেল) যা ক্ষারের সাথে বিক্রিয়া করে ফ্যাটি অ্যাসিডের ক্ষারীয় লবণ তৈরি করে।

অপরদিকে, ডিটারজেন্ট হল একটি সারফ্যাক্ট্যান্ট বা কিছু সারফ্যাক্ট্যান্টের মিশ্রণ যার লঘু দ্রবণে পরিস্কার করার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাজারে হরেক রকমের সাবান পাওয়া যায় তারমধ্য গ্লিসারিন সমৃদ্ধ, স্বচ্ছ, তরল (হ্যান্ড ওয়াশ), রান্নাঘর, লন্ড্রি, অভিনবতা, অতিথি, মেডিকেটেড ও সৌন্দর্যবর্ধক সাবান অন্যতম।

আমাদের নিকট সাবান মৃদু ও স্নিগ্ধকারক মনে হলেও অণুজীবের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ধ্বংসাত্মক বস্তু। সাবান মুলত আমরা হাত ধোঁয়া ও গোসলের জন্যই বেশি ব্যবহার করি। অপরদিকে, ডিটারজেন্ট সাধারনত আমরা কাপড়, থালা-বাসন, আসবাবপত্র ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পরিস্কারে ব্যবহার করে থাকি। এগুলো অ্যানায়নিক, ক্যাটায়নিক, নন-আয়নিক বা জুইটার আয়নিক প্রকৃতির হয়ে থাকে।

সাবান কিভাবে করোনাভাইরাসকে ধ্বংস করে?
সাবান মুলত পিন-আকৃতির অণু দিয়ে তৈরি,যার প্রত্যেকটির একটি হাইড্রোফিলিক মাথা (যা পানি পছন্দ করে) এবং একটি হাইড্রোফোবিক লেজ (যা পানিকে দূরে রাখে এবং তেল বা চর্বির সাথে সংযোগ স্থাপন করে) রয়েছে।

করোনাভাইরাসের বাহিরের আবরণটি লিপিড বা তৈলাক্ত পদার্থ দিয়ে গঠিত। ফলে পানিতে মুক্ত-ভাসমান সাবান অণুগুলির হাইড্রোফোবিক লেজগুলি জলকণা এড়ানোর চেষ্টা করে; ভাইরাসগুলির লিপিড ত্বকে নিজেদেরকে আটকে রাখে এবং পরিশেষে ভাইরাসগুলিকে পৃথক করে দেয়।

এরপর কিছু সাবান অণু ভাইরাসটির ত্বকের রাসায়নিক বন্ধনগুলিকে ব্যাহত করে এবং ভাইরাস ত্বকে ছোট বড় বহু ছিদ্র সৃষ্টি করে। ফলে বাহির থেকে অতিরিক্ত জলকণা ভাইরাসটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।

ভাইরাস কোষের অন্তঃচাপ ও বাহিরে থাকা সাবানের কণাগুলোর কার্যকারিতায় অবশেষে ভাইরাসের কোষের অভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে আসে এর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গাণু যার মধ্য জিনগত উপাদানসমূহ রয়েছে।

মূলত ভাইরাসের ত্বকটি ফেটে যায় এ প্রক্রিয়ায়। ফলে ভাইরাসটি মারা যায়। অপরদিকে, সাবানের কণাগুলো নিয়ে গঠিত বিশেষ প্রক্রিয়া যা মাইসেলি নামে পরিচিত তা বিনষ্ট হওয়া ভাইরাস উপাদানগুলোকে ঘিরে ফেলে। ফলে পানি দিয়ে পরবর্তিতে হাত ধোঁয়ার সময় সেগুলোও আমাদের হাত থেকে সরে পড়ে।

করোনায় হাত ধোঁয়ার জন্য কোন ধরনের সাবান ব্যবহার করবেন?
মূলত সাবানের জল-মিশ্রিত একটি ফোঁটা বহু করোনাভাইরাসকে মেরে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট। বিশেষজ্ঞ শিটসের মতে, সব ধরনের সাবান করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ে। তবে হাত ধোঁয়ার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

যেমন কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের জন্য সাবান এবং পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে। অর্থাৎ ২০ সেকেন্ডর কম নয় উপরন্তু ৩০ সেকেন্ড হলে ভালো হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ৩০ সেকেন্ড সময় নেয় করোনা ভাইরাসটিকে নিস্ক্রিয় করতে। অনেকটা এমন যে- আপনার বাচ্চার সাথে শুভ জন্মদিনের গানটি দুথবার গাওয়া সম্ভব হবে এ সময়ে।

সাবান ছাড়া অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করা যাবে কি?
করোনা মোকাবেলায় সাবান ছাড়া হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে যেন আপনার হ্যান্ড স্যানিটাইজারটিতে কমপক্ষে ৬০% ইথানল (অনুমোদিত মাত্রা: ৬০-৮০%) অথবা ৭০% আইসোপ্রোপানল (অনুমোদিত মাত্রা: ৭০-৭৫%) থাকে।

এক্ষেত্রে পরিমিত পরিমান হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে হাতের সমস্ত অংশে লাগান এবং হাত না শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের জন্য ঘোষলে ভালো হয়। যদি হাতে দৃশ্যত কোন ময়লা থাকে তাহলে সাবান ও পানি ব্যবহার করাই উত্তম।

 

করোনা মোকাবেলায় ফ্লাই অ্যাশ, ছাই, ক্লে ইত্যাদি এগুলোও ব্যবহার করা যেতে পারে। কাপড় কাচার জন্য বাজারে যে ডিটারজেন্ট পাওয়া যায় তার লঘু দ্রবণ দিয়েও হাত ধোঁয়া যাবে।
করোনা প্রতিরোধে অনুমোদিত হ্যান্ড স্যানিটাইজারের উপাদান সমূহ হল (১) ইথানল (৮০%) অথবা আইসোপ্রোপানল (৭৫%), (২) গ্লিসারিন/গ্লিসারল (১.৪৫%) ও (৩) হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড (০.১২৫%)।

শিশুদেরকে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের প্রতি আকৃষ্ট না করতে অস্বচ্ছল অ্যালকোহল ব্যবহার করা যেতে পারে। মূলত এ ধরনের অ্যালকোহলের খারাপ স্বাদকে শিশুরা অপছন্দ করে।

১০ টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে রাখা ভালো:
১) সাবান বা ডিটারজেন্টের সাথে ঠাণ্ডা অথবা উষ্ণ পানি দুটোই করোনাভাইরাসকে প্রতিহত করতে সমানভাবে কার্যকর। তবে হাতের জন্য মানানসই উষ্ম পানি ব্যবহার করা উত্তম।
২) কিছু হ্যান্ড স্যানিটাইজারে বেনজালকোনিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে অ্যালকোহলের তুলনায় কিছু অণুজীবের বিরুদ্ধে এর কম নির্ভরযোগ্য কার্যকলাপ পাওয়া গেছে।
৩) সব সময় হাতের নখ কেটে ছোট করে রাখুন। কারণ নখের মধ্যে ময়লা ও বিভিন্ন অণুজীব লুকিয়ে থাকে। হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করা ভালো এবং ধৌত করার সময় আঙুলের ভাঁজসহ ফাঁকা স্থানগুলোর দিকে বিশেষ নজর রাখুন।
৪) দিনে কতবার সাবান দিয়ে হাত ধৌত করতে হবে এর কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে হাত না ধুয়ে কোন কিছু খাওয়া বা নাক, মুখ, চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। যখনই সন্দেহ হবে তখনই আপনার হাত ধুয়ে নিন। সকালে ঘুম থেকে উঠেই এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও আপনার হাত ধুয়ে নিন।
৫) হ্যান্ড স্যানিটাইজার শিশুদের দৃষ্টি ও নাগালের বাইরে রাখুন। এটি ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪০.৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে সংরক্ষণ করা উচিত নয়। গরম আবহাওয়ায় এটিকে গাড়িতে সংরক্ষণ করা উচিত নয়। অল্প পরিমাণে হ্যান্ড স্যানিটাইজার পানে শিশুদের মধ্যে অ্যালকোহলজনিত বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যদি আপনার শিশু হ্যান্ড স্যানিটাইজার পান করে ফেলে তাহলে দ্রুত বিষ নিয়ন্ত্রক অফিস বা কোনও মেডিকেল ডাক্তারের শরনাপন্ন হোন।
৬) ‘এফডিএ’ অ্যারোসোলাইজড জীবাণুনাশক দিয়ে মানুষের শরীরে স্প্রে করার পরামর্শ দেয় না। সুতরাং আমাদের দেশে যানবাহনে বা বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত স্প্রে জাতীয় জীবাণুনাশক নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তাছাড়া এই পদ্ধতিটি কোভিড-১৯ এর বিস্তারকে রোধ বা হ্রাস করার ক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকর তার জন্য বর্তমানে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্যও নেই।
৭) পৃষ্ঠতলে ব্যবহৃত জীবাণুনাশক স্প্রে কোন প্রাণীর ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা উচিত নয়। এগুলি শুধুমাত্র কঠিন ও জড় বস্তু,অ-ছিদ্রযুক্ত পৃষ্ঠগুলিতে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়।
৮) মানুষের অ্যান্টিসেপটিক ওষুধ যেগুলো হ্যান্ড স্যানিটাইজারে অনুমোদিত তা শুধু আমাদের ত্বকে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়ে থাকে। এগুলোও এয়ারোসোলাইজেশনের উদ্দেশ্যে নয়।
৯) অ্যালকোহল সম্বলিত হ্যান্ড স্যানিটাইজারগুলোও স্প্রেতে ব্যবহার উপযোগী নয় কারন এগুলো ফুসফুসে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং এদের রয়েছে দাহ্য ক্ষমতা।
১০) অ্যালকোহল সম্বলিত হ্যান্ড স্যানিটাইজারগুলো আমাদের হাত ব্যতীত শরীরের আর কোথাও ব্যবহার উপযোগী নয়। এগুলো খাওয়া কিংবা শ্বাসের মাধ্যমে বা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে নেয়া যাবে না।

 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ-৮১০০। 

এ বিভাগের আরও সংবাদ
//graizoah.com/afu.php?zoneid=3354715