ঢাকা বিকাল ৩:২৫, বুধবার, ১২ই আগস্ট, ২০২০ ইং, ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

মনে নেয়া, মেনে নেয়া, মানিয়ে নেয়া

আমেরিকার এক গবেষকের নতুন বুদ্ধি এলো। পোষা বানরটাকে নিয়ে একটি নিরীক্ষা চালালেন তিনি। আগুনে সেঁক দিয়ে গরম করা একটি রড এনে বানরের গায়ে লাগালেন। সেঁকাগ্রস্ত বানর মনে করলো তার মনিব ভুল করে রডটি লাগিয়ে ফেলেছেন। তাই একটু অবাক হলেও তেমন গুরুত্ব দেয়নি বানর।
একটু পর আবারো সেঁকা দিলো মালিক। পরপর কয়েকবার। এবার বানর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে তীব্র প্রতিক্রয়া দেখালো। রাগী প্রতিবাদ জানালো। কারণ বানরটি কেন এই সেঁকা খাবে তা মানতে পারলো না। এভাবে কয়েকদিন সেঁকা দেয়া হলো।
তবে কয়েকদিন পর বানর আর প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। বানরের মনে মনে বুঝে নিয়েছে বেঁচে থাকতে হলে এভাবে সেঁকা খেয়ে চলতে হবে।
এটাই তার জন্য নতুন নিয়ম। অথবা নিয়তি। মানবজাতির অবস্থাও যেন সেই বানরের মতো। প্রথনে করোনা ভাইরাস আমলেই আসেনি অনেকের।
“ওটা আমাদের হবে না”, “আমাদের দেশে আসবে না”, “এটা-ওটা করলেই ওটা ফিনিশ”- এমন কথাগুলো বেশ চাউর হলো। করোনাকে ‘চাইনিজ ভাইরাস’ নামে অভিহিত করে বলটা ভিন্ন দিকে ঠেলার প্রয়াস দেখা গেল। তথ্য লুকানো ও ভাইরাস ছড়ানোর বাদ-বিবাদও কম দেখা গেল না।
অবশেষে একদিন আমাদের সব হিসেবের খাতা বদলে গেল। আক্রান্তের গণণায় ক্যালকুলেটর কুলিয়ে উঠতে পারলো না। মৃত্যুর গ্রাফগুলো চমকে দিলো। নিরন্তর গবেষণায় ব্যস্ত চিকিৎসা বিজ্ঞান থাকলো দিশাহীন। অহেতুক ফতোয়ায় নামা হঠকারী কিছু ধর্মীয় নেতা উধাও হলো।
মাস্ককে প্রাচ্যের অকার্যকর সংস্কৃতি বলা সেই পাশ্চাত্যের মুখে মুখে তা শোভা পেতে লাগলো। হাইড্রোক্লোরিনকে করোনার কোরামিন ভাবতে শুরু করা লোকজনকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে দিলো- এটা ঠিক হচ্ছে না, এতে রক্ষা মিলবে না। এভাবে দেখে-শুনে-ঠকে মনে ধারণা এলো মানবজাতি বিপদাপন্ন।
এরপর সকলে করোনা ভাইরাসজনিত বিপদ মেনেও নিলো। আর এখন মানিয়ে চলার পালা। করোনা ভাইরাস নিয়ে সম্প্রতি আপত্তিকর মন্তব্য করেন ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতি, আইন ও সুরক্ষা সমন্বয়কারী মন্ত্রী মোহম্মদ মেহফুদ। মন্ত্রী বলেন, ‘‌করোনা আমাদের স্ত্রীদের মতো।
প্রাথমিকভাবে আপনি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও, পরে আপনি উপলব্ধি করবেন যে, এটা আপনার হাতের বাইরে। এরপর আপনি এটাকে নিয়েই বসবাস করবেন।’‌ মন্তব্যটি নারী বিদ্বেষমূলক বলে চিহ্নিত। তবে রূপকার্থে বক্তব্যটিতেই করোনার বাস্তবতা ধরা পড়ছে।
এখন বলা হচ্ছে যে, করোনার আগের এবং পরের পৃথিবী হয়তো এক থাকবে না। বদলে যাবে মানুষ। পাল্টে যাবে সামাজিক রীতিনীতি। পরিবর্তন আসবে অভ্যাস-বদঅভ্যাসে। বিশেষজ্ঞরা বলতে শুরু করেছেন, করোনাভাইরাস বিদায় নেওয়ার পর সম্পূর্ণ অন্য এক পৃথিবীতে পদার্পণ করতে যাচ্ছি আমরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মিঃ রাজীব নন্দী এটাকে আখ্যায়িত করেছেন, “Post corona new normal life” হিসেবে।
এটা হবে নতুন ধাঁচের লাইফস্টাইল। এক নদীর একই পানিতে যেমন দুবার সাঁতার দেয়ার সুযোগ থাকে না, তেমনি এখানে গেছে যেদিন একেবারেই গেছে। ‘এভাবে আর কিছু দিন গেলে পরবর্তী প্রজন্ম মনে করবে নাকটাও একটা গোপনাঙ্গ’- এটা কেবল আর রসবাক্য নয়, বাস্তবতাও হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা বিজ্ঞানী অ্যান্থনি ফাউসি তো এমন এক আশংকায় বলেছেন, “পৃথিবী হয়তো আর কখনো স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাবে না।”
এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে কী করতে হবে? উত্তর পরে। আসুন আগে একটি সুখবর পড়ে নিই। এই করোনাকালে পৃথিবী নামে এই গ্রহবাসীর জন্য একটি বিশাল সুখবর দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ইইউর পক্ষ থেকে কোপারনিকাস অ্যাটমসফিয়ার মনিটরিং সার্ভিস (সিএএমএস) ও কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস (সি৩এস) জানিয়েছে, বরফে ঢাকা উত্তর মেরুর আকাশে ওজন স্তরে ১০ লাখ বর্গ কিলোমিটারের যে বিশাল গর্ত সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি নিজে নিজেই সারিয়ে তুলেছে। এই বিশাল গর্তটি নিয়ে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
কেননা উত্তর মেরুর আর্কটিক অঞ্চলের আকাশে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়ায় সেখানকার পোলার ভর্টেক্স বা মেরু ঘূর্ণাবর্ত অনেকটাই স্থিতিশীল হয়ে পড়ে। সেইসঙ্গে অঞ্চলটিতে বায়ুমণ্ডলে ক্লোরিন ও ব্রোমিনের মতো বিষাক্ত কেমিক্যালের উপস্থিতিও বেড়ে যায়, যা ওজন স্তরকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, করোনাভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবীর উৎপাদন-শিল্পায়ন ও ভোগবিলাসের চাকা স্থবির হয়ে পড়ায় পৃথিবীর পরিবেশ প্রকৃতি যে বিশ্রামের সুযোগ পেলো, তারই ফল এই ওজন স্তরের গর্ত ভরাট। উপরের সংবাদে বুঝাই যাচ্ছে, করোনাকালেও প্রকৃতি থেমে নেই। আপনমনে নিজের কাজ করে যাচ্ছে।
দূষণ কমিয়ে মহামূল্যবান অক্সিজেনে ভরে দিচ্ছে বিশ্ব। ওজন স্তরের বিপদজনক গর্তগুলো ভরাট করে বড় বিপদ থেকে রক্ষা করছে। এখন আমরাও এই প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নিতে পারি। জীবনাচরণে ঢুকে পড়া অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস-বদভ্যাসের গর্তগুলো আমরা এই সুযোগে ভরাট করে ফেলতে পারি।
মানবিকতায় ধরা পড়া ফাটলগুলো মেরামত করতে পারি। ঝুঁকি সরিয়ে নিরাপদ খাদ্য উপাদানে পৃথিবী ভরিয়ে তুলতে পারি। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সেবার সক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে নিতে পারি। প্রকৃতির সাথে ক্রমেই বিনষ্ট হওয়া সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে পারি।
স্রেফ মুখরোচকের পেছনে না দৌড়ে পুষ্টির পেছনে ছুটতে শুরু করতে পারি। অহেতুক আয়েশি-বিলাসী জীবনের চেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সুস্থধারার জীবন গড়তে পারি।
আসুন, মনে নিয়ে নিই- করোনা আর দশটি যেমন তেমন ভাইরাস নয়। মেনে নিই, করোনা ভাইরাসজনিত বিপদকে সর্বাবস্থায় মনে রেখে পথ চলতে হবে। মানিয়ে নিই, গ্লাভস-মাস্ক-স্যানিটাইজার নির্ভর, অসামাজিক ও সতর্ক জীবন ব্যবস্থা।
So, welcome to post corona new normal life! আর এখন করোনাকালের জীবনটায় মরহুম আইয়ুব বাচ্চুর সুর বাজাতেই হবে, ‘বদলে গিয়েছ তুমি, বদলে গিয়েছি আমি, বদলে গিয়েছে সময়।’ অথবা সেই দরাজ গলার চেনা আওয়াজের মতো সাজাতে হবে জীবন,’চলো বদলে যাই।’
লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

 

এ বিভাগের আরও সংবাদ
//graizoah.com/afu.php?zoneid=3354715