ঢাকা সন্ধ্যা ৭:৩১, শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২০ ইং, ১৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনা

শিক্ষা ও গবেষণাখাতে কেমন বাজেট চান শিক্ষার্থীরা

মহামারি করোনা ভাইরাসে স্থবির হয়ে পড়েছে গোটাবিশ্ব। দেশে দেশে কর্মহীন হয়ে পড়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক মন্দা। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়।
এরই মাঝে শুরু হয়ে গেছে নতুন অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনার । মহামারি কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে কিভাবে চাঙ্গা করা যায় তা নিয়ে শুরু হয়েগেছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২০-২১অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের অন্যান্য খাতের ন্যায় ভেঙ্গে পড়েছে শিক্ষাখাতও। বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণাখাতে কাঙ্ক্ষিত বাজেট চান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
 শিক্ষাখাতের সংকট উত্তোরণে বাজেট ঘোষণায় সুদূরপ্রসারী ভাবনা প্রতিফলন দেখতে চান তাঁরা। দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা ফুটে উঠেছে শিক্ষা ও গবেষণাখাতে কেমন বাজেট চান তাঁরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মো: ওমর ফারুক জানিয়েছেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে আসন্ন বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণায় খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই । কেননা আমরা যদি প্রতি অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যায় যে শিক্ষা খাতের সঙ্গে সব সময়ই প্রযুক্তি বাজেট সংযুক্ত থাকে। অথচ সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে শিক্ষা খাতের বাজেট ও তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা উচিত। বিশ্বের অন্যন্য দেশে শিক্ষা ও গবেষণার উপর বেশী থেকে বেশী জোর দেয়া হয়। কেননা শিক্ষা ও গবেষণা জাতিকে এগিয়ে যেতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা খাতে যে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয় সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন অপ্রতুলতার কারণে গবেষণার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। আমরা যদি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে মানবসম্পদের বিনিয়োগ ও ফলাফল পেতে চাই তাহলে উচ্চ শিক্ষা বাজেটকে ভিন্ন ভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পূর্ববর্তী বছরের বাজেটের থেকে এবছরের বাজেটে দেশের শিক্ষা ও গবেষণায় রাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হোক। যার ফলশ্রুতিতে আগামীতে দেশে দক্ষ মানবশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মো: রকি আহমেদ জানান, করোনার প্রকোপে দেশের অর্থনীতি একেবারে স্থবির হয়ে পড়েছে, শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা আরও শোচনীয়। করোনার কারণে আসন্ন বাজেট (২০২০-২১) প্রণয়ন যে অনেক চ্যালেঞ্জিং হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। গত ৭-৮ বছর ধরে শিক্ষা খাতে বাজেট ১১ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশের মধ্যে স্থির। গত ২০১৯-২০ বাজেটে ছিল ১১.৭ শতাংশ। যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নিম্নতম বাজেট। অথচ ইউনেসকো এডুকেশন ফ্রেমওয়ার্কে একটি দেশের মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং শিক্ষা ক্ষেত্রে এ স্বল্প বাজেটে আমরা উচ্চ শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সক্ষম হব না। এছাড়া প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে গতানুগতিক স্বল্প বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয় এতে শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মান বৃদ্ধি সম্ভব নয়। করোনা ভাইরাস শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। করোনার এ দূর্যোগে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ল্যাবে করোনা টেস্টের মাধ্যমে জাতীয় দূর্যোগে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে। অথচ উন্নত যন্ত্রপাতি, পিসিআর মেশিনের অভাবে দুই-একটি ছাড়া বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের কল্যাণে এগিয়ে আসতে পারছে না। যেখানে বিপুল সংখ্যক ডাক্তার ব্যতিত শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাজে লাগিয়ে দিনে অসংখ্য নমুনা টেস্ট করা সম্ভব। এতে করে শিক্ষার্থীদের গুণগত মানও বৃদ্ধি পেত। তাই শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে এ বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি একান্ত কাম্য। এছাড়া করোনার কারণে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের টিউশন বন্ধ হওয়ায় ও অস্বচ্ছল অভিভাবকরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় সারা দেশে বিশেষ করে ঢাকায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী মেসভাড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছে। দেশে অস্বচ্ছল অভিভাবকরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। তাই এ বছর শিক্ষা ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা বৃদ্ধিতে বরাদ্দকৃত বাজেটের আকার বাড়বে বলে প্রত্যাশা।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহরিয়ার আহমেদ মিলান বলেন, একটা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করে মান-সম্মত শিক্ষার উপরে।সেক্ষেত্রে মান-সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এ খাতে বাজেট বাড়ানো বিকল্প কিছু নেই। মোট বাজেটের কমপক্ষে শতকরা ২০-২২ভাগ শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে হওয়া উচিৎ। প্রতি বছর আমাদের যে বাজেট প্রনয়ণ করা হয় তাতে ২-৩ ভাগ থাকে এই খাতে কিন্তু সেই বাজেটের প্রায় সিংহভাগ চলে যায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে। সেক্ষেত্রে উচ্চতর পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের প্রনোদনা চালু করা যেতে পারে।মান সম্মত শিক্ষার ব্যাপারে যেমন বাজেটের আকার বাড়াতে হবে পাশাপাশি সেই মান অক্ষুণ্ণ আছে কিনা সেটার জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে।আমাদের কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রকৌশল ও গবেষণার মান বাড়ানোর জন্য আরো নজর দিতে হবে।শিক্ষার মান উন্নয়নে পাঠ্যবই বিতরণ, মান সম্মত শিক্ষক নিয়োগ,কারিগরি শিক্ষায় জোরদার, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে,অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার পাশাপাশি প্রকৌশল খাতের বাজেট আলাদা করতে হবে। এই সব দিকগুলো ভালোভাবে নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চাকা সুন্দরভাবেই ঘুরতে থাকবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবিএম রায়হানুল ফেরদৌস জানায়, শিক্ষা খা‌তের বা‌জে‌টে বেসরকা‌রি শিক্ষায় আলাদা গুরুত্ব দেওয়া চাই দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষাব্যবস্থা বেসরকারি ব্যবস্থাপনা নির্ভর। অথচ অনুপাত অনুযায়ী শিক্ষা বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থের ৯৭ ভাগ বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার পেছনে ব্যয় করা হয় না। বেসরকারি শিক্ষা খাতে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত আছেন। অথচ সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বেতন-ভাতা বৈষম্য চরম। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা কেবল স্কেলের মূল বেতনটুকুই সরকারিদের সমান পেয়ে থাকেন। বাকি সব ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যে আছেন তাঁরা। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান থেকে পিয়ন পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া পান মাত্র ১০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা পান ৫০০ টাকা যা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের ডাক্তারের ফি-ই মেটানো সম্ভব নয়। তিনভাগ শিক্ষার্থী পড়ানো সরকা‌রি শিক্ষকবৃন্দ বাড়ি ভাড়া পান বেতনের ৪৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ, চিকিৎসা ভাতা পান ১৫০০-২০০০ টাকা। সরকারি শিক্ষকরা মূল বেতনের শতভাগ উৎসব ভাতা হিসেবে পেলেও বেসরকারি শিক্ষকরা পান মূল বেতনের মাত্র ২৫ ভাগ আর কর্মচারীরা ৫০ ভাগ অর্থ। এরূপ যেসকল স্থা‌নে বেসরকা‌রি শিক্ষা প্র‌তিষ্ঠান, শিক্ষক, কর্মচা‌রিরা ব‌ঞ্চিত হ‌চ্ছেন, সে‌দি‌কে সরকা‌রের আলাদা নজর দেওয়া প্র‌য়োজন ম‌নে ক‌রি। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। শিক্ষা খাতে বরাদ্দকে ব্যয় হিসেবে গণ্য না করে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা জরুরি। সত্যিকারের উন্নয়নের জন্য শিক্ষা চাই এবং উন্নয়নকে টেকসই করতে চাই গুণগত শিক্ষা। দে‌শের সংখ্যাগ‌রিষ্ট শিক্ষার্থীদের প্র‌তিষ্ঠান, বেসরকা‌রি শিক্ষা প্র‌তিষ্ঠানসমূ‌হে তাই সরকা‌রের বাড়‌তি গুরুত্বা‌রোপ চাই।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনির মৃর্ধা বলেন, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড।শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পারে না।বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা ও গবেষণার কোন বিকল্প নেই। আমাদের দেশকে উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। বিগত বাজেটগুলোতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও বাজেটে ছিলনা উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার কোন প্রণোদনা।প্রতিটি শিক্ষার্থীর যথোপযুক্ত মানোন্নয়নে কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি ।শিক্ষা খাতে বাজেটের যথোপযুক্ত বন্টন হচ্ছে না।বরাদ্দকৃত অর্থের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ ব্যয়িত হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ খুবই কম।কিন্তু আমরা জানি শিক্ষার গুরুত্বমান বিবেচনায় গবেষণাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।উন্নত দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়।একজন শিক্ষার্থী হিসাবে আমি মনে করি বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তার সুষম বন্টন করতে হবে এবং সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য অর্থের পরিমাণ বাড়াতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো নয়, শিক্ষার মানোন্নয়ন ই সময়ের দাবী।সরকারের পক্ষে শিক্ষা খাতের দূর্নীতিকে একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়। তাই সকল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হলে বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং বন্টন করতে হবে। এর সাথে গবেষণা খাতকে প্রাধান্য দিতে হবে।
এ বিভাগের আরও সংবাদ
//graizoah.com/afu.php?zoneid=3354715