ঢাকা রাত ৯:৪২, শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২০ ইং, ১৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সময়ের বাঁকে বাঁকে

করোনায় স্বাস্থ্যসেবা ঠিক রাখতে দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হওয়ার বিকল্প নেই

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯ শনাক্তের) সংক্রমণের তৃতীয় মাসে গিয়ে পরিস্থিতির অনেকটাই অবনতি শুরু হয়েছে। চলতি মাসে আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যু, সংক্রমণ শনাক্তের হার- সবই দ্রুত বেড়েছে। এর মধ্যেই আক্রান্তের শীর্ষ ২০ দেশে ঢুকে গেছে বাংলাদেশের নাম। আজ ৮ জুন দেশে কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস শনাক্তের তিন মাস পূর্ণ হচ্ছে। করোনাভাইরাসের বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে এখনই আশার আলো খুঁজে পাওয়া কঠিন। আক্রান্তে শীর্ষ বিশের বেশিরভাগ দেশেই চতুর্থ মাসে গিয়েও দেখা গেছে সংক্রমণের উর্ধ্বগতি। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো টেস্ট, লকডাউন, আর চিকিৎসাসেবায় আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তাদেরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে। সে তুলনায় আমরা অনেকটাই পিছিয়ে ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে পরিস্থিততি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। আর ভয়টা এখানেই।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো করোনার আঘাতে রীতিমত ভেঙে চুড়ে গেছে দেশের গোটা চিকিৎসা ব্যবস্থা। ডাক্তার-নার্স-রোগী থেকে শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্যসেবা একেবারেই এলোমেলো হয়ে পড়েছে। এমনকি হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক করা গুরুতর রোগীদেরও ভর্তি নিচ্ছে না অনেক হাসপাতাল।

একদিকে যেমন অভিযোগ রয়েছে যে করোনায় আক্রান্ত রোগীরা নানাভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। দিগ্বিদিক ছুটে করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালে গিয়েও সুবিধা করতে পারছেন না। ফলে দেশে অধিকাংশ করোনাআক্রান্ত রোগীই বাসায় বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। করোনায় ঘরে বসে চিকিৎসা নেয়ার সাফল্যও কিন্তু ভালো। কিন্তু সব রোগের ক্ষেত্রে ঘরে বসে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব না। করোনা ছাড়া বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হতে যাচ্ছেন, তাদের কাছে চাওয়া হচ্ছে ‘কোভিড-১৯ নেই’ মর্মে প্রত্যয়নপত্র। কথা হলো উপসর্গ নিয়েই যেখানে টেস্ট করাতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা সেখানে অন্যান্যরা কিভাবে করোনা না থাকার প্রত্যয়নপত্র দেখাবে? এ অবস্থায় অনেক রোগী এ হাসপাতাল-সে হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। এমনকি চিকিৎসক পরিবারের রোগীরাও পাচ্ছেন না হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। দেশের স্বাস্থ্যসেবার এ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে অনেকবারই। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের এ ধরনের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি ডাক্তার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সকলের প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নাগরিকদের বলেছেন নিয়ম মেনে সবকিছু করার জন্য। কিন্তু এতদসত্ত্বেও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নয়ন পরিলক্ষিত হচ্ছেনা।

করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে গোটা বিশ্বই বিপর্যস্ত। এ ভাইরাসের ভ্যাকসিন বা প্রপার ট্রিটমেন্ট এর বিষয়ে নিশ্চিত হতে এখনো হিমশিম খাচ্ছে গোটা বিশ্ব। তাই বাংলাদেশও খানিকটা টলে ওঠায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু করোনার কারনে গোটা চিকিৎসা সেবা খাতের এমন ভঙ্গুর দশাটাই প্রমাণ করছে আমরা কতোটা পিছিয়ে। কেবল করোনাই একমাত্র রোগ নয়। মানুষ হাজার রকমের সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। আর সেই সমস্যা নিরূপণ আর সে অনুযায়ী সেবা দেওয়ার কথা হাসপাতাল ও চিকিৎিসকদের। আর সেখানে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। একদিকে সাধারন রোগীরা যেমন চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে রোগের উপসর্গ দেখা দেয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ডায়াগনসিসও করা যাচ্ছে না। চিকিৎসাসেবার এ অবস্থায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছে মানুষ। প্রশ্ন হল, দেশে এই যদি হয় স্বাস্থ্যসেবার হাল, তাহলে নানা রোগে আক্রান্ত হওয়া মানুষ চিকিৎসার জন্য যাবে কোথায়? খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। এর মধ্যে খাদ্যের সংস্থান করতেই সরকারকে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে। সবকিছু নতুন করে তৈরি করতে হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নানা উদ্যোগে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। সমাজের নানা স্তরের মানুষ এগিয়ে আসছেন। এর সবই নতুন করে করতে হচ্ছে। কিন্তু স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা সেবার একটা প্রতিষ্ঠিত অবকাঠামো আগে থেকেই ছিল। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতালের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা অপ্রতুল হলেও সেটা খুব বেশি সমস্যার নয়। চিকিৎসক আর হাসপাতাল যে পরিমাণে রয়েছে তার সঠিক ব্যবহার করতে পারলেই কিন্তু চিকিৎসা সেবার মান অনেকটাই বেড়ে যেত।

চিকিৎসাসেবা পাওয়া মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের কোনো অধিকার নেই রোগীদেরকে এ অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে। তেমনি রাষ্ট্রের নির্দেশনা স্বত্ত্বেও হাসপাতালগুলোর এমন আচরণ রীতিমতো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। বস্তুত করোনা আতঙ্কে চিকিৎসক ও নার্সদের একটি বড় অংশ সব ধরনের চিকিৎসাসেবা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) স্বল্পতা এবং সাধারণ রোগীরা যে করোনা আক্রান্ত নন, তা নিশ্চিত না হওয়ার কারণেই মূলত চিকিৎসাব্যবস্থায় এ সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক সুরক্ষা সরঞ্জাম দেয়া হয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে চিকিৎসকদের কেন এত ভয়? বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেয়ার কারণে।

করোনার কারণে অন্য রোগীরা চিকিৎসা পাবেন না, এ পরিস্থিতি মেনে নেয়া যায় না। একটি দেশের স্বাস্থ্য খাত এভাবে চলতে পারে না। অনেক রোগীর জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। সময়মতো চিকিৎসার অভাবে তারা প্রাণ হারাতে পারেন। কাজেই এ অচলাবস্থার অবসান জরুরি।
যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বত্রই বিরাজ করছে করোনা আতঙ্ক। চিকিৎসকদের মধ্যেও এ আতঙ্ক থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে তারা হাসপাতালে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা দেবেন না, তা হতে পারে না। আমরা মনে করি, সরকারি-বেসরকারি কোনো চিকিৎসক বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে রোগীর চিকিৎসা বা তাকে ভর্তি না করানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক অথবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, করোনার চিকিৎসায় যেমন, তেমনি অন্য সব রোগের চিকিৎসার ব্যাপারেও তারা দায়িত্বশীল হবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আহ্বান মেনে সবাই মানবিক হই। যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হয়ে এ বিশাল সংকটের মোকাবেলা করার চেষ্টা করি। প্রধানমন্ত্রীর মতো আমরাও বিশ্বাস করি এ যুদ্ধে জয় আমাদের হবেই।

মেহেদী হাসান বাবু
সম্পাদক ও প্রকাশক

এ বিভাগের আরও সংবাদ
//graizoah.com/afu.php?zoneid=3354715