ঢাকা দুপুর ২:০০, শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২০ ইং, ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

অফুরন্ত বন্ধে আগামীর দক্ষ শিক্ষার্থীরা

 

এই বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিলে সরকার বাধ্য হয় সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে। সেই সুবাদে অফুরন্ত সময় পেয়ে বসে শিক্ষার্থীরা। এই সময় অনলাইন ক্লাসের দিকে অনেক প্রতিষ্ঠান ধাবিত হলেও বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নেয়ার পক্ষপাতী না। এক সময় এই করোনা চলে যাবে কিন্তু রেখে যাবে তার আচর। অর্থনীতির যে ক্ষতিসাধন হয়েছে তা পোষাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকগণ কর্মী ছাঁটাই করবে এবং অধিক কাজ করতে পারবে এমন ব্যক্তি নিয়োগ দিবে। তাই, যত বেশি দক্ষ হওয়া যায় চাকরির বাজারে তত বেশি চাহিদা তৈরি হবে। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য এই বন্ধের সময় উৎকৃষ্ট সময়। ইন্টারনেট প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে গিয়েছে অনেক তরুণ। সেই সকল তরুণদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে কথা বলে তাদের মতামত তুলে ধরেছেন- ইকবাল হাসান

 

আব্দুল্লাহ আল মারুফ, কৃষি অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: স্নাতক অধ্যায়ের সমাপ্তি লগ্নে এসে জীবনের সব থেকে বড় শিক্ষাটা এই মহামারি শিখিয়েছে। করোনা পরবর্তীকালে চাকরি ক্ষেত্রে বেশ ভালো রকমের প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে। এই প্রতিযোগিতায় নিজেকে এগিয়ে রাখার জন্য শুরু করি বিভিন্ন অনলাইন কোর্স করা। বেশির ভাগ কোর্স গুলো ছিলো ডিজিটাল টেকনোলজি ট্রান্সফরমেশন এবং আত্মউন্নয়নমূলক। বিশেষ করে এমএস অফিস, ডাটা সায়েন্স, প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন এর উপরে গুরুত্ব দিয়েছি। পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রুবক বলে আমি মনে করি। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির সঠিক ও সর্বোচ্চ ব্যাবহার আমাদের কে নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করবে। “মুক্তপাঠ” এর কোর্স দিয়ে আমি অনলাইন কোর্স করা শুরু করি। পরবর্তীতে কোর্সেরা, ইউডেমি, ফিউচার লার্ন, এডিবি লার্নিং, লিংকডইন সহ আরো বেশ কিছু ওয়েবসাইট থেকে কোর্স করা শুরু করি। বর্তমানে আমি প্রায় একশত সার্টিফিকেট অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করেছি। পুরো বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অনলাইন কোর্স করা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা সেদিক থেকে পিছিয়ে নেই। “সবলরাই টিকে থাকে” এই কথাটি মনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।

 

মুসলিমা তন্নী,লোক প্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়: করোনা আতংকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গৃহবন্দী সময়টা যেন শরীর ও মনের উপর বিরূপ প্রভাব না ফেলতে পারে তাই এর যথাযথ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। প্রথমত, আমার ভালো লাগার বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছি যেগুলো সময়-সুযোগের অভাবে চর্চা করা হয়ে উঠেনি। ইংরেজি ভাষার দক্ষতা অর্জনের জন্য নিয়মিত চর্চা করেছি। তথ্যপ্রযুক্তির বহুলব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার(যেমন: মাইক্রোসফট এক্সেল, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট ইত্যাদি) ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করছি। পাশাপাশি গল্পের বই পড়েছি এবং রিভিউ লিখেছি। এছাড়াও অস্কার বিজয়ী ও অন্যান্য পুরস্কারপ্রাপ্ত দেশি-বিদেশি সিনেমা, বিবিসি ডকুমেন্টারিসহ বিভিন্ন শিক্ষনীয় ও মোটিভেশনাল ভিডিও দেখেছি। গতিশীল বিশ্বের সাথে তাল মেলানোর জন্য লিডারশীপ স্কিলের কোনো বিকল্প নেই। তাই বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশীপ সেন্টার এর প্যানেল ডিসকাসশন থেকে অর্জিত জ্ঞান পরিবারে ক্ষুদ্র পরিসরে চর্চা করছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ থেকে সমসাময়িক বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখার চেষ্টা করেছি। ‘উঁড়ষরহমড়’ নামক অ্যাপের মাধ্যমে স্প্যানিশ ভাষাটা আয়ত্ত করছি। এছাড়াও রান্না যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা তাই রান্নায়ও কিছুটা সময় দিয়েছি।

 

রাসেল আহমেদ, ফিন্যান্স এবং ব্যাংকিং, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়: এই দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আমার পড়াশুনায় নেতিবাচক প্রভাব পরতে শুরু করে। কিন্তু কোর্সেরাতে প্রায় ১২০০+ কোর্স সম্পূর্ণ ফ্রিতে করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এই কোর্স গুলো গধংংরাব ঙঢ়বহ ঙহষরহব ঈড়ঁৎংবং বা গঙঙঈ নামে সর্বাধিক পরিচিত৷ যা বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোর্সেরা বা বিভিন্ন অনলাইন এডুকেশন প্লাটফর্মের মাধ্যমে অফার করে থাকে। যার বেশিরভাগ কোর্সই প্রিমিয়াম। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগীতায় কোর্সেরা এর স্পন্সর একাউন্ট পাওয়ার পর যতটা সময় পেরেছি ঘরে বসে অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করে কাটিয়েছি। এতে একদিকে যেমন নিজের অলস সময়টাকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে কাজে লাগিয়েছি অন্যদিকে ঘরে বসে নিজেকে করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেছি। কোর্সেরাতে বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দক্ষতা সম্পূর্ন শিক্ষকের চমকপ্রদ ভিডিও ক্লাস করার সুযোগ পেয়েছি। যা আমাকে আমার একাডেমিক মূল বিষয় সম্পর্কে আরো গভীর জ্ঞান অর্জন, আত্মউন্নয়ন ও চিন্তা শক্তি বিকাশে অনেক সহযোগীতা করেছে। আমি গত দুই মাসে কোর্সেরা থেকে মোট ১৫ টি কোর্স সম্পূর্ন করেছি। আমি আশা করি পরবর্তী সময়ে যা আমার জীবন বৃত্তান্তে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।

 

মুহাম্মদ জহির রায়হান, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়: “সময় এবং স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করেনা” এই প্রবাদ মনেপ্রাণে ধারণ করি। করোনা সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকটাই অবসর জীবনযাপন করছি। কিন্তু এমন অনেকেই আছেন যাদের খুব বেশী অবসর সহ্য হয়না আমিও সেই দলেরই লোক। এই অবসর সময়ে কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেই প্রশ্নের উত্তর খুজতে খুজতেই দেখলাম আমাদের সামনে জ্ঞানের সাগর মহাসাগর রয়েছে; অথচ আমরা টেরই পাইনি। কার্যত এমন কিছু প্লাটফর্মের খোজ পেলাম যেখানে বিশ্বের নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঘা বাঘা প্রফেসরদের সান্নিধ্যে আসা যায় মূহুর্তেই এবং অর্জন করা যায় নানাবিধ জ্ঞান এবং যেখানে ইচ্ছেশক্তিটাই একমাত্র হাতিয়ার। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৬৪ টি কোর্স আমি সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছি এবং আমি মনেকরি এই কোর্সগুলো করতে গিয়ে আমি যে ৬০০ ঘন্টারও বেশী সময় আমি বিনিয়োগ করেছি এই সময়গুলো আমার জীবনের অন্যতম সেরা সময়। মাইক্রোসফট অফিস, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, ভ্যালু চেইন ম্যানেজমেন্ট, প্রেজেন্টেশন স্কিল, কমিউনিকেশন স্কিল, ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর বিজনেস, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স, পাইথন ফর ¯ট্যাটিস্টিক্স সহ আরো বেশ কিছু বিষয়ে ঘরে বসে বিশ্বসেরা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স করার জন্য সুযোগ করে দিয়েছে বিভিন্ন প্লাটফর্ম যেমন: কোর্সেরা, ইউডেমি, ফিউচার লার্ন, এডিবি লার্নিং, লিংকেডইন। এছাড়াও কয়েকটি দেশীয় প্লাটফর্মের মাধ্যমেও বেশ কিছু কোর্স করার সুযোগ পেয়েছি যেমনঃ বহুব্রীহি এবং মুক্তপাঠ। এসকল কোর্সের মাধ্যমে আমার পছন্দের বিষয় গুলো সম্পর্কে অনেক বেশী জানা হলো; আগের চাইতে কিছুটা হলেও বেশী দক্ষ হলাম এবং নিজেকে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে কিছুটা হলেও এগিয়ে যেতে পারলাম। আগামীর বিশ্ব দক্ষতার, সেই বিশ্বে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে দক্ষ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

বিজনেস বাংলাদেশ / আতিক

এ বিভাগের আরও সংবাদ
//graizoah.com/afu.php?zoneid=3354715