ঢাকা বিকাল ৪:৩৫, রবিবার, ৫ই জুলাই, ২০২০ ইং, ২১শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

মৃত্যুর দুয়ারে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মানবতা

কখনো করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তিদের দাফন বা সৎকার করতে ব্যাস্ত সময় পাড় করছেন, আবার কখনো মানুষের ভয়কে জয় করতে ছুটছেন। আবার কখনো খাবারের থলি নিয়ে ছুটছেন অসহায়, দুস্থ নিন্ম কিংবা মধ্যবিত্তদের বাড়ি বাড়ি। আবার কখনো লকডাউন নিশ্চিত করতে পথে প্রান্তরে ছুটছেন। কখনো অসাধু ব্যাবসায়ীদের কবল থেকে মানুষকে রক্ষায় বাজার মনিটরিং বা ভ্রাম্যমাণ আদালত বসাচ্ছেন। গুজব রুখতে নজর দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

নরসিংদী জেলার ২২ লক্ষ মানুষকে সুস্থ রাখতে হবে। তাই সর্বসাধারণকে সুস্থ রাখতে ঘরে রাখতে দিন রাত জেলা জুড়ে চলাচ্ছেন সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন। গত দুই মস ধরে করোনাভাইরাসের সংকট মোকাবেলায় এভাবেই চলছে নরসিংদী জেলা প্রশাসনের ৩৪ তম বিসিএস ক্যাডার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহ আলম মিয়া’র নিত্য নৈমিত্যিক কর্মকাণ্ড।

সকল কিছুকে ছাপিয়ে সর্বশেষ করোনায় মৃত ব্যক্তি বা করোনা উপসর্গ নিয়ে ১১ জন মৃত ব্যক্তিদের দাফন বা সৎকার করে প্রশাসনের এই কর্মকর্তা জেলাজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মানবিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সমর্পণ করে দেয়ায় সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ কোভিড-১৯ ভাইরাসের মহামারীর আতঙ্কে মানুষ আজ ঘরবন্দী। একটু অসাবধানতায় জীবন পড়তে পারে চরম বিপর্যয়ের মুখে। এমনকি জীবন প্রদীপও নিভে যেতে পারে। ঠিক এমন সময় গর্ভবতী স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে ঘরে রেখে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে সাধারণ মানুষের সুরক্ষার জন্য দিনরাত নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও করোনা প্রতিরোধ সেল নরসিংদী সদর উপজেলার কুইক রেসপন্স টিমের আহ্বায়ক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহ আলম মিয়া।

একই মানুষের দিনরাত একসাথে এতো দায়িত্ব পালন, এ যেন গল্প-সিনেমার হিরোদেরকেও হার মানায়। সবকিছু ছাপিয়ে তার অতিমানবিক গুণ ও কর্মদক্ষতায় তিনি নরসিংদীতে সবার মাঝে হয়ে উঠেছেন একজন ‘বাস্তব জীবনের সুপার হিরো’।

জানতে চাইলে নরসিংদী জেলা প্রশাসনে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহ আলম মিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আদর্শের প্রতি আমার দুর্বলতা রয়েছে। আমার ইচ্ছা জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা। আর এ নির্দেশনাটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছেন নরসিংদীর জনবান্ধব জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমার মাতৃতুল্য অভিভাবক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন। যেকোন পরিস্থিতিতে দৃঢ় মনোবল নিয়ে কাজ করার মতো করে তিনি আমাকে নিজে হাতে তৈরী করেছেন। আমাকে হাতে কলমে কাজ শিখিয়েছেন, মানবিক হতে সাহস যুগিয়েছেন, পরিশ্রমী হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। সেই প্রেরণা থেকেই আমি দিনরাত কাজ করে চলেছি।

২০১৬ সালে ৩৪তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নরসিংদীতে যোগদান করেন এই কর্মকর্তা। এরপর থেকে তিনি নিজেকে উজাড় করে নরসিংদীর মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। জেলার সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের সাথে সমানতালে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সততার সাথে তিনি তার দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করে চলেছেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে নরসিংদী সদরে তার যোগদানের পর ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং দাপ্তরিক অন্যান্য কাজের স্বচ্ছতা ও গতিশীলতার জন্য তিনি ভূমি অফিসে আগত সেবাপ্রত্যাশী এবং তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন।

তার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ‘আন্তর্জাতিক পাবলিক সার্ভিস ডে’ উপলক্ষে পরপর দু’বার নরসিংদীতে সেরা কর্মকর্তা নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে সততা ও কর্মনিষ্ঠার জন্য তিনি জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কার অর্জন করেন। এর আগে ২০১৪ সালে কারিতাস বাংলাদেশে কাজ করার সময় তিনি ‘ত্যাগ ও সেবা দিবসে’ শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা নির্বাচিত হন।

এছাড়া ২০১৫ সালে বাংলাদেশ কাস্টমসে কাজ করার সময় সেখানেও তিনি সেরা কর্মকর্তার সম্মান অর্জন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণসংযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষে ২০১৩ সনের শেষের দিকে কারিতাস বাংলাদেশ-এ কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন শাহ আলম মিয়া। এর আগে কিছুদিন তিনি সাংবাদিকতাও করেন।

ভয়ঙ্কর করোনা মহামারীতে নিজের স্বজনরা যেখানে তাদের আক্রান্ত প্রিয়জনকে ফেলে চলে যাচ্ছেন; সেখানে ভয়কে জয় করে পরম মমতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিত্যদিনের চিকিৎসা, খাওয়া-দাওয়া, প্রতিবেশীদের অবহেলা ও দুর্ব্যবহার থেকে রক্ষাসহ যাবতীয় বিষয় দেখভাল করছেন তিনি। এমনকি আক্রান্তদের মৃত্যুর পরও জাত-ধর্ম ভেদ না করে নিজেই উপস্থিত থেকে সম্পন্ন করছেন শেষ বিদায়ের কাজ। এ পর্যন্ত তিনি হিন্দু মুসলিম মিলিয়ে লাশ সৎকার করেছেন প্রায় ১১টি।

এছাড়াও এই ভয়াবহ মহামারীতে সাধারণ মানুষকে ঘরে ফেরানোর কার্যক্রম থেকে শুরু করে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত, ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুস্থ ও অসহায়দের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ, ‘করোনা’ উপসর্গযুক্ত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ, আক্রান্ত রোগীর বাড়ি লকডাউন, হাসপাতালে নেয়া, খাওয়া-দাওয়া, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, করোনা আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে তার সৎকার সম্পন্ন করা, কখনো কৃষকের মাঠে ধান কেটে দেয়া, কখনো মাস্ক, স্যানিটাইজার বিতরণসহ তিনি সবই করে চলেছেন সিদ্ধহস্তে।

ঘরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আর বয়স্ক মাকে রেখেও নিজের দায়িত্ববোধ আর মানবিকতার তাড়নায় তিনি দিনরাত অবিরাম ছুটে চলেছেন নরসিংদীর প্রান্তিক জনপদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সবমিলিয়ে একের পর এক মহানুভবতার ঘটনায় তিনি হয়ে উঠেছেন নরসিংদীর মানুষের বিশ্বস্ততা ও ভরসার প্রতীক।

আগামী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে এই দম্পতির ঘরে প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার কথা রয়েছে। এ সময়ে একজন স্বামী হিসেবে তার স্ত্রীর পাশে থাকাটা খুব জরুরি। কিন্তু দায়িত্বের প্রশ্নে একই ছাদের নিচে থেকেও তিনি বিচ্ছিন্ন রয়েছেন পরিবার থেকে। কাছ থেকে প্রিয়তমা স্ত্রী ও মায়ের সাথে পর্যন্ত একসাথে বসে কথাবার্তা বা খাওয়া-দাওয়া হয় না দীর্ঘদিন। কারণ তিনি করোনা রোগীদের সংস্পর্শেই বেশিরভাগ সময় থাকেন। তাই তিনি নিজের থাকার রুম থেকে শুরু করে খাবার দাবারের জিনিসপত্র, কাপড়-চোপড় সবই আলাদা করে নিয়েছেন। নরসিংদীর জনপদের মানুষকে নিরাপদ রাখতে তিনি নিজের ভোগবিলাসকে উৎসর্গ করে পরিবার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখছেন।

জানতে চাইলে এই কর্মকর্তার সহধর্মীনি আশা জানিয়েছেন, সংকট সারাজীবন থাকবে না। হয়তো চাকরির সময়ের পর আমাকে সময় দিতে পারতো। তাতে শুধুমাত্র আমি উপকৃত হতাম। এখন জেলার ২২ লক্ষ মানুষ উপকৃত হচ্ছে। এই সংকটময় সময়ে সে নরসিংদীর লাখো মানুষের পাশে থেকে সেবা দিতে পাড়ছে। এর চেয়ে খুশির আর কিছুই নেই। তার জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। তিনি যেন এইভাবেই প্রশাসনে থেকে প্রান্তিক মানুষকে সেবা দিতে পারে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ইমরান

এ বিভাগের আরও সংবাদ
//graizoah.com/afu.php?zoneid=3354715