ঢাকা রাত ১১:১১, শনিবার, ৪ঠা জুলাই, ২০২০ ইং, ২০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা

কৃষি সংকট ও করণীয়

আজ পুরো পৃথিবী এক অদৃশ্য শক্তির কাছে জব্দ । অচলাবস্থা বিরাজমান পুরো বিশ্বে। উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশেরও উন্নয়নের চাকা আজ থমকে গেছে মহামারী করোনার ছোবলে। থমকে গেছে দেশের অর্থব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, কৃষি ব্যবস্থা এবং শিল্প-ব্যবস্থা। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের জিডিপির একটি বড় অংশ আসে এই দেশের কৃষি খাত থেকে। দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন অনেকটা নির্ভর করে দেশের কৃষি ব্যবস্থার উপর। কিন্তু করোনায় এখন অন্যান্য খাতের মতো কৃষি খাতেও দেখা দিয়েছে সংকটময় পরিস্থিতি। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে সেই প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই কাজ করে আসছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)।এ বিষয় নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরী করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক তানিউল করিম জীম

করোনায় এই ঘোর সংকটে কিভাবে কৃষকদের সহায়তা করা যায় এবং সংকট কাটিয়ে কৃষির উন্নয়ন অব্যাহত রাখা যায় তা নিয়েও ভাবছে এখানকার শিক্ষকরা। এদিকে শুরু থেকেই বাকৃবি করোনা শনাক্তকরণে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজকে সাহায্য করে আসছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেখানে শনাক্তকরণের কাজ করে ময়মনসিংহ মেডিকেলকে সাহায্য করছে। শনাক্তকরণের মাত্রা বৃদ্ধিকরণে ময়মনসিংহ মেডিকেলকে একটি পিসিআর মেশিনও হস্তান্তর করা হয়।

করোনায় প্রথম সারির সৈনিকদের (পুলিশ ও চিকিৎসকেদের) সুরক্ষার জন্য বাকৃবির নিজস্ব ফ্যাব ল্যাবে তৈরিকৃত ফেস শিল্ড প্রদান করা হচ্ছে ।

এছাড়াও কৃষকদের যে কোনো সহায়তার জন্যে বিভিন্ন অনুষদে (মাৎস্য, কৃষি, ভেটেরিনারি, পশুপালন) চালু করা হয়েছে টেলি উপদেশ/ টেলিমেডিসিন সেবা কার্যক্রম। যেখানে ফোন করে যেকোনো সমস্যার সমাধান পাবেন কৃষকরা।

বর্তমান কৃষিতে কি কি সংকট এবং তা থেকে উত্তোরণে আমাদের কি করা প্রয়োজন সে সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম জাকির ‍হুসাইন আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন-

করোনায় কৃষিতে প্রথম সংকট ছিল বোরো ধান কাটা নিয়ে। কৃষকের দুঃচিন্তার শেষ ছিল না। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের কৃষকদের ধান কাটা নিয়ে বড় সংকট তৈরি হয়। পরে সরকার উদ্যোগ নিয়ে অন্য এলাকা থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটার ব্যবস্থা করেন। অন্যদিকে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়েও ধান কেটে কৃষকের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। আবার শ্রমিকদের শ্রমমূল্য বেশি এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বাদে যা থাকে তা খুব সামান্য। সুতরাং কৃষকদের সবসময়ই গুনতে হচ্ছে লোকসান। লাভ করছে মধ্যসত্বভোগীরা। আর ন্যায্য মূল্যে জিনিস কিনতে পারছেন না ভোক্তারা। তাই খাদ্য-শস্য বিপণন ব্যবস্থায় প্রয়োজন কঠোর নজরদারি। শাক-সবজি থেকে শুরু করে সকল খাদ্য –শস্যের বিপণনে চরম বৈষম্য বিরজমান রয়েছে।

 

বর্তমানে আমের বাজারেও দেখা দিবে এমন বৈষম্য । সঠিক বিপণন ব্যবস্থার জন্য আমরা যা করতে পারি-

• কৃষি পণ্যের বাজার ও মূল্য সংক্রান্ত তথ্যাদি উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে প্রদর্শন করা।
• সমবায় ভিত্তিক কৃষি ফসল উৎপাদন করা এবং অঞ্চল ভিত্তিক কালেকশন পয়েন্ট স্থাপন করে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা।
• প্রতিটি উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে যারা সবজি চাষ করে তাদের সাথে স্থানীয় উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের একটি Mou (সমঝোতা স্মারক) করা যেতে পারে। উক্ত Mou অনুযায়ী চাষীদের উপর আলাদাভাবে মনিটরিং থাকবে এবং ফসল তোলা পর্যন্ত তাদের কোয়ালিটি নিশ্চিত করে ঢাকার বিভিন্ন সুপার শপে সরবরাহ করা যেতে পারে।
• খাদ্য অধিদপ্তরের ধান, চাল, গমের সংরক্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি আলু, পেঁয়াজ, টমেটোসহ কৃষকের মৌসুমি সবজি সংরক্ষণের জন্যে পর্যাপ্ত হিমাগারের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারী উদ্যেক্তাদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
• সরকারী উদ্যোগে কৃষি পরিবহন সার্ভিস চালু করা যেতে পারে।
• কৃষকের প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে পণ্যের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা।
• সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ না দেওয়া। সেজন্যে কঠোরভাবে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা।
• কৃষক চুক্তিবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে এবং সে অনুযায়ী ফসল উৎপাদন করবে।
• ফসল উৎপাদন খরচ কমানোয় সরকারি ভর্তুকি কৃষকের হাতে না দিয়ে উপকরণের মূল্যের সাথে দেওয়া।
• কৃষিকে ব্যবসায় রূপান্তরের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং অঞ্চল ও ফসল ভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠা করা।

 

আইসিটির ব্যবহারের মাধ্যমে-

কৃষকদের জন্য কল সেন্টার-ভিত্তিক সমাধান খুব কার্যকরি হবে। কোনো বাজারের নির্দিষ্ট পন্যের সঠিক মূল্যের তথ্য পাওয়া যাবে। একটি আপডেটেড অ্যাপস থাকবে যেখানে প্রতিটি পন্যের বাজার মূল্যে লিপিবদ্ধ থাকবে। সেই সাথে আরতদার, পাইকার, ফড়িয়া ও উৎপাদিত কৃষকের ও তথ্য থাকবে। অনলাইন একটা প্ল্যাপফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে কৃষক, ভোক্তা, পাইকার, উদ্যোক্তা সবাই যুক্ত থাববেন। সবার সাথে সবার সমন্বয় থাকবে এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে।

বোরো ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে। এখন এটা সংরক্ষণ করাটাও জরুরি। সরকার কৃষদের থেকে ধান কিনবে মাত্র ৯/১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশ ধান সংরক্ষিত হয় কৃষকদের ঘরে এবং রাইস মিলগুলোতে। কিন্তু বর্তমানে রাইস মালিকরা ধান কিনছে না। বাজারে দাম কমে গেলে তারা টন টন ধান কিনে মজুত করবে যার কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

এজন্য সরকারের উচিত রাইস মিল ব্যবসায়ীদের এখনি ধান কিনতে বলা। এতে কৃষকরা সঠিক দাম পাবে। এছাড়া যেকোনো ফসল সংরক্ষণের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে উপজেলা পর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কারণ সঠিক সংরক্ষণের অভাবে আমাদের দেশে অনেক খাদ্য-শস্য নষ্ট হয়।

কৃষিতে সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তির প্রয়োজন ও করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন-

কৃষিতে সংকট কাটবে যান্ত্রিকীকরণে, ভূমিকা রাখবে কৃষি প্রকৌশলীরা।বর্তমানে কৃষি ক্ষেত্রে বড় একটি সংকট হলো শ্রমিক সংকট। এ সংকটটি করোনায় আরো প্রকোট আকার ধারণ করেছে। হাওর অঞ্চলে যখন ধান কাটা নিয়ে কৃষকের দুর্ভোগের শেষ নাই। তখন তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে কৃষি যন্ত্র। ধান কাটা, ঝাড়া, মারাই করে কৃষকের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে কম্বাইন হারভেস্টার। যেখানে ১% ধান কাটা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল সেখানে হাওর অঞ্চলে যন্ত্র দিয়ে সরকার ১০% ধান কাটার ব্যবস্থা করেছে । কৃষক একদিকে যেমন তার উৎপাদিত ফসলের দাম পাচ্ছে না, অন্যদিকে শ্রমিক মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যার কারণে কৃষক তার উৎপাদিত ফসল থেকে লাভ তো পাচ্ছেই না বরং লোকসান গুনতে হচ্ছে। কৃষিকে লাভজনক পেশায় পরিণতকরণ এবং টেকসই করতে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ যন্ত্র ব্যবহারে যেমন শ্রমিক সংকট দূর হবে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচও কমবে। জমি চাষ, বীজ বপন, আগাছা ছাটাই, কীটনাশক প্রযোগ, ফসল সংগ্রহ, পরিবহন এবং সংরক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষি উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করবে । অন্যদিকে উৎপাদন খরচ কমাবে। কারণ প্রযুক্তি ব্যবহারে বীজের অপচয়, শ্রমিক খরচ, ফসলের অপচয় কমানো সম্ভব। কিন্তু কৃষিতে যে যন্ত্রগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে (ধান লাগানো ও ধান কাটার রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার, ট্রাক্টর, পাওয়ার ট্রিলার) সেগুলোর টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং কৃষকদের যন্ত্র সম্পর্কে জানানোর জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রকৌশলী। যার ব্যবস্থা আমাদের নেই। তাই কৃষকরা এসব যন্ত্রের সাথে পরিচয়ের সুযোগ পাচ্ছে না এবং যন্ত্রের সঠিক ব্যবহার ও সুবিধাও তারা জানতে পারছে না। তাই কৃষকরা যন্ত্র ব্যবহারে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তাই যারা এই কৃষিযন্ত্রের সাথে পরিচিত, যারা কৃষি যন্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করে তাদের এসময়ে কাজে লাগিয়ে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণে রূপান্তর করা উচিত। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি শক্তি এবং যন্ত্র বিষয়ে পড়ানো হয় এবং বিএসসি কৃষি প্রকৌশল ডিগ্রি প্রদান করা হয়। আমি মনে করি, করোনায় যেমন জরুরি ভাবে ডাক্তার, নার্সদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঠিক, তেমনিভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উচিত কৃষি প্রকৌশলীদের নিয়োগ দিয়ে তাদের দক্ষতা কৃষক পর্যায়ে কাজে লাগিয়ে কৃষির উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা। কৃষি যন্ত্র প্রস্তুতকারক বিভিন্ন কোম্পানিও পারে কৃষি প্রকৌশলীদের নিয়োগ দিয়ে তাদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কৃষকদের যন্ত্র ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলতে। আমাদের মনে রাখতে হবে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কৃষি সংকট একমাত্র কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন যে, এক ইঞ্চি জমিও ফাকা রাখা যাবে না। কৃষকরা এই নির্দেশনা তখনি মানবে যখন তাদের হাতে কাছে সুস্থ্য-সবল বীজ পাবে। এজন্য উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের বীজ সরবরাহ করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সর্বপ্রথম আমাদের কৃষকদের বাঁচাতে হবে । তবেই তারা জমি চাষ করে ফসল ফলিয়ে খাদ্য এবং অর্থনীতি সংকট দূর করবে। এজন্যে কৃষি পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিতকরণ, সঠিকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করে কৃষিতে সংকটদূর করে কৃষককে বাঁচাতে হবে। বাঁচবে কৃষক, চাষবে জমি, দেশের অর্থনীতির হবে উন্নতি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ
//graizoah.com/afu.php?zoneid=3354715