ঢাকা রাত ৯:৩৬, শনিবার, ৩০শে মে, ২০২০ ইং, ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ড.আনিসুজ্জামান এবং আমার পি এইচ ডি থিসিস

অন্ধকারকে লাঠিপেটা করে তাড়ানো যায় না, আলো দিয়ে তাড়াতে হয়। আসলে অন্ধকার বলতে কিছু নেই, আছে আলোর অনুপস্থিতি। তিনি আলোচিত ছিলেন না, আলোকিত ছিলেন। এই সমাজে আলোকিতরা আলোচিত নন। ভূমিদস্যু সন্ত্রাসী লুঠেরা কালোবাজারি আলোচিত।দেশের বাতিঘর ড. আনিসুজ্জামান আলোচিত ছিলেন না,আলোকিত ছিলেন। সারাজীবন আলো দিয়ে অন্ধকার দূরীভূত করেছে। এক শুদ্ধতম মনীষী। যিনি শিক্ষা দেননি ভিতরে ভিতড়ে নির্মাণ করেছেন হাজারো আলোকিত মানুষ।
প্রচারে পণ্যের প্রসার ঘটে,বিদ্যায় নয়,তিনি তা জানতেন বলেই নীরবে নিভৃতে জ্ঞান চর্চ্চা ও দান করতেন। কখনো প্রচার চাননি। স্যারের জীবনটা দেখলেই বুঝা যায় মহৎ মানুষের জীবন মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি মননে মগজে আচরণে উচ্চারণে এক অসাধারণ মানুষ। সোনা দানা ডায়মন্ড মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু এ সবের কাছে কিছু শেখার নেই।
ড. আনিসুজ্জামান স্যারের জীবন হতে অনেক কিছু শেখার আছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,’আমাদের দেশে যার অঢেল টাকা সে বড় লোক, মনুষ্যত্বের বিষয় আশয়ে নয়’। স্যার ছিলেন, মনুষ্যত্বে প্রকৃত বড় লোকের পথিকৃৎ। শেক্সপিয়ার বলেছেন, কোন কোন মানুষ একবার মরে, কোন কোন মানুষ দুইবার মরে। মহৎ মনীষীদের দেহগত মৃত্যু হলেও ইতিহাসের পাতা ও মানুষের স্মৃতি হতে মৃত্যু হয় না। ইতিহাসের পাতা ছেঁড়া যায়, মুছা যায় না।স্বাধিকার হতে স্বাধীনতা অর্জনে স্যারের ভূমিকা এবং লেখনি ইতিহাসে অজয় অমর অক্ষয় অব্যয় হয়ে থাকবে মহাপ্রলয়ের শেষ রজনী পর্যন্ত। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে স্মৃতিচারণ হয়,ইতিহাস হয় না।
ইতিহাস হয় জীবন দিয়ে।তাঁর জীবনটাই ছিল দেশের জন্য উৎসর্গ।তাই তিনি বাঙালি জাতির ইতিহাসের অংশ। সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, ‘জীবনটাকে লম্বায় বড় করা যায় না, পরিধিতে বাড়াতে চেষ্টা করুন’। স্যার মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে যতটুকু হায়াতে জিন্দেগী নিয়ে এসেছেন তা টেনে লম্বায় বড় করতে পারেননি কিন্তু মানবতার কাজের মাধ্যমে জীবনের পরিধিকে বাড়িয়ে ছিলেন অনেক বেশী। সংস্কৃতিতে একটি কথা আছে, ‘কীর্তির্যস্য স জীবতি’ অর্থাৎ মানুষের কীর্তিই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, ‘জন্মেছিস যখন, দুই একটি দাগ রেখে যা’। এক ইংরেজ কবি বলেছেন, ‘Foot prints on the sands of time’ অর্থাৎ সময়ের বেলাভূমিতে পদচিহ্ন রেখে যাওয়া। সব কথার একই সূর, তা হলো একটা নাড়া দিয়ে যাওয়া। কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘কেউ নাড়া দেয়,কেউ সাড়া দেয়’। এ সব মনীষীরা নাড়া দিয়ে যায় আর আমরা সাড়া দিই। আমরা স্মরণ করি কিন্তু অনুসরণ করি না। একজন বুদ্ধিজীবীর চরিত্র কী রূপ হওয়া প্রয়োজন তা স্যারের জীবন হতে শিখার আছে।
তিনি সুশীল ছিলেন না, ছিলেন সিভিল। সুশীল মানে ভদ্র,বাকী সবাইকে অভদ্র বলি কী করে? ড. মুনতাসির মামুন এ সব তথাকথিত সুশীলদের আখ্যায়িত করেছেন, ‘সুশীল বাটপার’। সব কিছুর উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু উন্নত কালের মানুষগুলো দিনে দিনে আত্মকেন্দ্রীক হচ্ছে। এমনই সময় মহামানব নয়,প্রকৃত মানুষ পাওয়া কষ্টকর।উপকারী মানুষ নয়, এখন আমরা অপকার করে না এমন মানুষ খুঁজি। ভালবাসার মানুষ চাই না, ঘৃণা না করলেই চলে। এমনই সময় একজন প্রকৃত বড় মাপের মানুষের বিদায় বেদনাহত করে। হুমায়ুন আজাদের ভাষায় বলতে চাই,’কারো কারো মৃত্যুতে জাতীয় পতাকা অর্ধ নমিত হয় না,পূর্ণ নমিত হয় হৃদয়’। পূর্ণ নমিত হওয়ার এক বাতিঘরের আলো আজ নিভে গেল। স্যার জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন।
এ সব পুরস্কারের কথা লেখা অপ্রয়োজন।কারণ কোন কোন পুরস্কার মানুষকে দামী করে আর কোন কোন মানুষ পুরস্কারকে দামী করে। স্যার যে সব পুরস্কার পেয়েছেন, সে সব পুরস্কার স্যারকে দামী করতে পারেনি, পুরস্কারগুলোই দামী হয়েছে। এ সব পুরস্কারের চেয়ে স্যারের মূল্য অনেক বেশী। কিছু মানুষের কাছে আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। তাদের মধ্যে স্যার একজন।
ছাত্র জীবন হতে তিনি আমাকে সাহস দিতেন, প্রেরণা যোগাতেন। আমি যখন চট্টগ্রাম সিটি বিশ্বিবদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি হতে বিদায় নিই তখন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে আমাকে রাখার জন্য স্যার বর্তমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের (তখন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী) মহোদয়ের নিকট সুপারিশ করেছিলেন। রাজনীতিকের বাইরে আমার জন্য তখন ভাষা সৈনিক এডভোকেট গাজীউল হক, ড. মুনতাসীর মামুন, সাংবাদিক আবেদ খানসহ অনেকেই সুপারিশ করেছিলেন।
কয়েক বছর কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় এক সময় হাল ছেড়ে ছাত্র রাজনীতির ইতি টেনে যুগলজীবনে পদার্পণ করি। ড. আনিসুজ্জামান স্যার আমার জীবনের এক অধ্যায়। আমার পি এইচ ডি গবেষণাপত্রের সেকেন্ডারী ডাটা সংগ্রহ কালে স্যার আমার প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করে কৃতার্থ করেন।
ডাটা সংগ্রহ করতে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে ২০/২২ নং বাড়ি, রোড নং-১৫,গুলশান-১, ঢাকার বাড়িতে কয়েকবার গেছি। স্যার জলযোগ করাতেন আর সময় দিতেন উদার ভাবে।(আমার পি এইচ ডি গবেষণাপত্রের সেকেন্ডারী ডাটার স্যারের একটি সাক্ষাৎকার এখানে সংযোজন করলাম)। স্যার হতে অনেক কিছু শিখে জীবনকে করেছি কিছুটা সমৃদ্ধ। দেহ হতে মানুষটার হৃদয়টা কত বড় হতে পারে স্যারের সান্নিধ্যে না গেলে বুঝা যাবে না। তিনি আমাকে ঋণী করে গেছেন।
যে ঋণ আমাকে নত করেনি, বড় করেছে।দরিদ্র করেনি ধনি করেছে। এই মহত মানুষটি আজ আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে, পৃথিবীর ফুল ফল গন্ধ পাখি সবুজ ছায়া হতে দূরে বহু দূরে। স্যার যেখানে থাকেন ভাল থাকেন, শান্তিতে থাকেন। দোয়া করি মহান আল্লাহ পাক আপনাকে যেন জান্নাত নসিব করেন।

 

এ বিভাগের আরও সংবাদ