ঢাকা সকাল ১০:০৩, মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২০ ইং, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সময়ের প্রয়োজনে এবারের ইদ

ইদ প্রত্যেক মুসলমানের কাছে আনন্দের একটি দিন। সকল বিভেদ ভুলে সকল মুসলমান এই দিনে আনন্দ করে কাটায়। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই বছর অন্য সব বছরের মত না। এই বছর করোনার, এই বছর অশ্রুর, বেদনার। কোন কাজ করতে গেলেই অদৃশ্য একটা হাত যেন থামিয়ে দেয়। বারবার ভেবে-চিন্তে কাজ করতে হয়। এই অদৃশ্য হাতকে করোনাই ধরা যায়। পবিত্র একটি দিন উদযাপন করতে গেলেও এই অদৃশ্য হাতের বাধা আসবে সেটাই স্বাভাবিক। জীবনের ভাঁজে ভাঁজে সুখ, দুঃখ থাকে সেখান থেকে শত দুঃখের মাঝে সুখ খুঁজে জীবনযাপন করাটাই তৃপ্তির। এরকম তৃপ্তি কিংবা সময়ের সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা চালাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এই ইদ তারা কেমন করে কাটাবেন সেই পরিকল্পনাই লিখেছেন- ইকবাল হাসান ও সজীবুর রহমান

ইয়াকুব আল হাফিজ
ইদ শব্দটাই যেন সবার মাঝে আনন্দের জোয়ার এনে দেয়। আর তা যদি হয় ইদুল ফিতর তবে তো কথাই নেই। তবে গত কয়েকদিন যাবত যখনই ইদের কথা মাথায় আসছে সেই আগের আমেজ পাচ্ছি না, সেটা পাওয়ার কথাও না। কারণ বিশ্বব্যাপী করোনার মহামারীতে যখন স্তব্ধ হয়ে পরেছে পুরো পৃথিবী সেখানে ইদের খুশি, ইদ নিয়ে যে ভাবনা তা আগের মতো থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। প্রতি ইদেই কমবেশি কেনাকাটা করা হয়, কিন্তু এবার মার্কেটে যাচ্ছি না। প্রতি ইদেই বাবা, ভাই সহ ইদগাহে যাওয়া হয়, এবার হয়তো যাওয়া হবে না। প্রতিবেশীদের বাসায় সেমাই খেতে যেতাম সেটাও হবে না এবার। বিকেলে নিয়ম করে ঘুরতে বের হতাম, এমনকি বৃষ্টি থাকলেও ঘরে থাকতাম না, সেখানে এবার নিজের, পরিবারের ও সমাজের কথা ভেবে ঘরে থাকবো বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এবারের ইদ ভিন্নভাবে কাটানোর জন্য মানুষিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। পৃথিবী সুস্থ হোক, সুন্দর ইদ আসুক আমাদের দুয়ারে।
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মোহাম্মদ হেলাল হোসাইন
হারিয়ে যাচ্ছে দৈনন্দিনের স্বাভাবিক জীবনযাপনের রুটিন। প্রত্যেক বারের মতো এই ঈদে তেমন আশা নেই, চাহিদা নেই, অপেক্ষা নেই, নেই শান্তিময় পরিস্থিতি। শপিংমলগুলো তে কেনা বেচার হট্টগোল নেই। করোনার পরিস্থিতি বাংলাদেশে দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে এই নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক রকম হতাশা কাজ করছে। সবাই স্বাভাবিক ভাবে সুস্থ হলেও মানসিক ভাবে অনেকেই ভেঙে পড়ছে। তারপরেও ঈদের বার্তা সবার কাছেই আসবে নিয়মমাফিক নামাজ পড়া হবে দুরুত্ব বজায় রেখে। সবার সাথে আলিঙ্গন করা হবে না। বন্ধুদের সাথে আড্ডা হবে না ,বাসায় এসে মাকে হয়তো রান্নার কাজে একটূ সাহায্য করবো , বন্ধুদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলবো। কোনো একটা মুভি দেখতে দেখতে যখন বিরক্ত হয়ে যাবো তখন হুমায়ূন স্যারের হিমু অথবা মিসির আলী পড়ে এই উৎসবের দিন কেটে যাবে প্রতিদিনের ন্যায়।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

তাইয়্যেবুন মিমি

ছেলেবেলা থেকেই সারাবছর যে উৎসবের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম সে হলো ঈদ। চাঁদ দেখা নিয়ে প্রতিযোগিতা, মেহেদিরাঙা হাত, পাড়ার মোড়ে মোড়ে তারাবাজির খেলা, নতুন জামার গন্ধ, বাচ্চাদের হাতে চকচকে নতুন টাকা ঈদী আর পরিবার নিয়ে আনন্দ করার দিন ঈদ। সারাজীবন এই একরকম নিরবিচ্ছিন্ন আনন্দময় ঈদই দেখে এসেছি। লম্বা ছুটি পাওয়া, বন্ধু বান্ধবের সাথে প্রথম কয়েকটা রোজা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালন করা, একসাথে ইফতার, এরপর বিশাল ব্যাগ গুছিয়ে হাজার লোকের ভিড় ঠেলে নীড়ে ফেরার আনন্দ -এগুলো ছিলো প্রতি রমজান ঈদের রুটিন। গত ২০১৯-এও এমনটাই করে এসেছি। অথচ এক বছরের ব্যবধানে হঠাৎ করে জীবনপ্রবাহ তার নিজের মতো বাঁক নিয়েছে। হুট করে নেমে এসেছে এক মহামারী ভাইরাস, পুরো বিশ্ব একযোগে জীবন-মরন যুদ্ধে যার যার মত লড়াই করছে। বিপদকালীন সময়ে মানুষ যত সংঘবদ্ধ থাকবে ততই প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই সহজ হবে। এই ঈদে সকলের এই বোধটি আসুক এই কামনাই করছি। আশা করছি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এই মাস শেষে এবারের ঈদ সত্যিই সবার জন্য আনন্দময় হবে প্রতিবছরের মত।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

রাসেল আহমেদ
এবারের ঈদ অন্য ঈদের মতো নয়। এবারের ঈদ হবে ধৈর্যের ও মানবতার। সবাই ধৈর্য ধারণ করে ঘরে থাকুন, পরিবারকে ভালো রাখার চেষ্টা করুন, দেশকে ভালো রাখুন। বিশ্বের এই ক্রান্তিকালে মানবতা ছড়িয়ে যাক ভালোবাসায়, ছিন্ন হোক সকল ভেদাভেদ ঈদের মহিমায় মুছে যাক সকল গ্লানি নতুন করে সূচনা হোক এক অন্য দিগন্তের। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মেনে চলি সকল পবিত্রতার রেখা। আর এবারের ঈদে সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই চাওয়া করোনাকে দূর করে কাছে যেন পাই বন্ধুদের। সুন্দর-স্বাভাবিক আগামীর প্রতীক্ষায় এত প্রতিকূলতার মধ্যেও অবরুদ্ধ জীবনকে মেনে নিয়ে নিতে হবে এই মহা উৎসবে। সুন্দর-স্বাভাবিক আগামীর প্রতীক্ষায় এত প্রতিকূলতার মধ্যেও অবরুদ্ধ জীবনকে মেনে নিয়ে নিতে হবে এই মহা উৎসবে।
শিক্ষার্থী, পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগ, যবিপ্রবি

জহুরুল ইসলাম
অন্যবার ঈদের সময় বন্ধুরা মিলে একে অপরের বাড়িতে যেতাম, তাদের সাথে ঈদ পরবর্তী সময়ে দূরে কোথাও ঘুরতে। এবারের ঈদে বলা যায় সব সময়টুকু বাড়িতেই কাটাতে হবে, তবুও আক্ষেপ করছি না। অন্য রকম একটা ঈদের অপেক্ষায় আছি। আমাদের সচেতনতায় আবার সুস্থ হয়ে উঠুক পৃথিবী। আর এবার আমি ঈদের কেনাকাটা করছি না। সবার কাছে আমার আহ্বান থাকবে, আমাদের চারপাশের যে মানুষগুলোর উপার্জনের পথ এখন বন্ধ হয়ে আছে (রিক্সাচালক,দিনমজুর) এই টাকাগুলো দিয়ে যেন তাদের ঈদের বাজার করে দেয়া। করোনার জন্য আপনার আমার আশেপাশে ঈদ আনন্দ থেকে যেন কেউ বঞ্চিত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা আমাদের সকলের উচিত। এবারের ইদ ভিন্নভাবে কাটানোর জন্য মানুষিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। পৃথিবী সুস্থ হোক, সুন্দর ইদ আসুক আমাদের দুয়ারে।
শিক্ষার্থী শিল্প ও উৎপাদন প্রকৌশল বিভাগ

নাজনীন সুলতানা
ঈদ মানে যে আনন্দ তা জীবনে প্রথম অনুভব করলাম ৯ বছর বয়সে, যখন গ্রামে ছিলাম। শহরে চলে আসার পরে আর তেমনভাবে ঈদের আনন্দ বুঝতে পারিনি। তবুও ছাদে গিয়ে ঈদের চাঁদ দেখা,বিটিভিতে “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ” গান শোনা এসবের আবেদন ছিল অন্যরকম। বাসায় বন্দী থেকে টিভি দেখা, ঘুমিয়ে আর খেয়ে পার করেছি জীবনের প্রায় সবগুলো ঈদ।
দূর থেকে অনেকদিন পরে প্রিয়জনের কাছে ফিরে আসবার অনুভূতি কেমন তা বুঝতে ইচ্ছে হতো। প্রতিবছর ঈদের দিনে অন্যতম একটা কাজ ছিল আলমারি থেকে আব্বুর পাঞ্জাবি বের করে আয়রন করে দেয়া।
এবছর আব্বু করোনা মহামারী জনিত পরিস্থিতিতে কর্মস্থলে অবস্থান করছেন তাই এবছর প্রথম আব্বুকে ছাড়া ঈদ করতে হবে। অনেক পরিবার এবছর প্রিয়জনকে ছাড়া ঈদ করবে। সবার মতো আমারও এজন্য খারাপ লাগছে। খুব তাড়াতাড়ি যেন সব মানুষের জীবন সুস্থ এবং সুন্দর হয়ে ওঠে।
পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ, যবিপ্রবি

আকিব ফেরদৌস নিলয়
পৃথিবীকে প্রথমবার আনন্দ ছাড়া ঈদকে বরণ করে নিতে দেখছি। গোড়ার থেকে বাঙালিরা উৎসবপ্রিয় জাতি। জাতিগত হোক বা ধর্মীয়, যেকোনো অনুষ্ঠান আমরা উৎযাপন করতে ভালোবাসি। বিশ্বের এই কঠিন করোনা পরিস্থিতিতে এই প্রথমবার বাঙালির রঙিন পহেলা বৈশাখ রঙের মেলায় সাজেনি তারই সাথে এই প্রথমবার আমরা দীর্ঘ সিয়াম সাধনা শেষ করে আনন্দের ঈদটাও একসাথে উৎযাপন করতে পারবো না।পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন ঈদ শব্দটির অর্থ তো আর পাল্টাবে না। ঈদ মানে আনন্দ আগেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আমরা ইচ্ছা করলেই এই নিরামিষ হোম কোয়ারেন্টাইনে বসেও ঈদটাকে আনন্দময় করে তুলতে পারি। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে আমরা কেউ সামাজিকভাবে দূরে নেই। আমরা সবাই যদি হাজার দুর্যোগ আর দুর্নীতির মধ্যেও গরিব মানুষের জন্য এইটুকু করতে পারি তাহলে টিকে থাকা কোনো ব্যাপার হবে না আমাদের জন্য।
মাৎস্য ও সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান বিভাগ, যবিপ্রবি

আসিফ আবেদীন আকাশ
বন্দি জীবন কখনোই সুখকর নয়। বন্দি অবস্থা জীবনকে পরাধীনতার স্বাদ এনে দেয়। বৈশ্বিক মহামারীতে পৃথিবী আক্রান্ত হওয়ায় পৃথিবী আজ অসুস্থ্য। থেমে গেছে মান পৃথিবীর মানুষগুলোর স্বাভাবিক জীবন। আতঙ্কে পৃথিবীবাসী হয়ে গেছে অবরুদ্ধ। বেড়েই চলেছে মৃত্যু-মিছিল। জীবনকে দিয়েছে পরাধীনতার স্বাদ। কিন্তু এদিকে নখদর্পণে দাঁড়িয়েছে মুসলমান জাতির সবচেয়ে বড় উৎসবের একটি ‘ইদ। ইদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে নতুন কাপড়, ঈদ মানে ঘোরাঘুরি, ঈদ মানে পুনর্মিলনী, ঈদ মানে সারা বছরে অপূর্ণ ইচ্ছা গুলো পূরণ করা। তারপরও সুন্দর-স্বাভাবিক আগামীর প্রতীক্ষায় এত প্রতিকূলতার মধ্যেও অবরুদ্ধ জীবনকে মেনে নিয়ে নিতে হবে এই মহা উৎসবে।
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

অরনী নাহার
বর্তমান পরিস্থিতিতে ঈদের জন্য একাটাই প্লান হতে পারে, সেটা হল অন্তত একটা সুবিধা বঞ্চিত পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি দেখে পরিস্কারভাবে ধারণা করা যায় এবারের ঈদ প্রথাগতভাবে উদযাপন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত মতে নিজ নিজ কর্মস্থানে পরিবার-পরিজন ছাড়া ঈদ পালন করবে অনেকে। মহামারীর কারণে এবারের ঈদ হবে অন্যরকম। আমাদের উচিত ঝুঁকি নিয়ে কেনাকাটার দিকে ধাবিত না হয়ে সেই অর্থ দিয়ে কর্মহীন অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন দুঃখি মানুষের পাশে দাঁড়ানো হবে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। নতুন পোশাক তো প্রতি বছর কেনা হয় এবার না হয় ভিন্ন ধরনের একটা ঈদ করি।

শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ, যবিপ্রবি

বিজনেস বাংলাদেশ / আতিক

এ বিভাগের আরও সংবাদ