ঢাকা সকাল ৮:১৫, মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২০ ইং, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সময়ের বাঁকে বাঁকে

করোনাভাইরাস ও আম্পানকালীন ঈদ: আসুন আনন্দ ভাগাভাগি করে নিই

একদিকে করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়ছে বিশ্ব, অন্যদিকে একদিন আগে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বিধ্বস্ত হয়েছে উপকূলীয় অঞ্চল। এমন ক্রান্তিলগ্নে পালিত হতে যাচ্ছে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। সময়টা একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর। সময়টা সবাইকে সাথে নিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াইয়ের।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল। তবে যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত ততটা প্রলয়ংকরী রূপ না নিলেও ক্ষতির পরিমাণটা কিন্তু কম নয়। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং সুন্দরবনের কারণে ঝড়টি খুব বেশি তাণ্ডবলীলা চালাতে পারেনি। ঘূর্ণিঝড়ের মূল আঘাত পড়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। তবে এটি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলেও প্রচুর তাণ্ডব চালিয়েছে। এক্ষেত্রে রক্ষাকবচের ভূমিকা পালন করেছে সুন্দরবন। গাছপালায় বাধা পেয়ে ঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমে আসে। এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয় গাছপালা, কাঁচা ঘরবাড়ি, বেড়িবাঁধ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জলোচ্ছ্বাসে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বহু মানুষ হয়ে পড়েছে পানিবন্দি। অনেক স্থানে বিদ্যুৎ, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বরগুনা, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। অনেক স্থানে ফাটল ধরেছে বাঁধে। এখন প্রয়োজন বানের পানিতে ফসল ডুবে গিয়ে এবং অন্যান্য কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো। যাদের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। যেসব এলাকা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে, সেসব এলাকার বাঁধ দ্রুত পুনর্র্নিমাণের উদ্যোগ নিতে হবে। আম্পানের ক্ষেত্রে আগাম ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার কারণে আমরা দেখেছি, উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছিল। সরকারের প্রচারণা ও আগাম সতর্কতামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপে মানুষ যে সতর্ক হয়ে উঠছে, এটি তারই প্রমাণ। দেশে এমন একসময় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানল, যখন করোনা মহামারী সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। তা সত্ত্বেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ প্রেরণ এবং তাদের পুনর্বাসনে নিতে হবে দ্রুত পদক্ষেপ। ত্রাণ কাজ স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হতে হবে।

এমনিতেই করোনার কারণে বহু মানুষের আয়-রোজগারের পথ হয়ে গেছে বন্ধ। তার ওপর ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে অনেকের কৃষিক্ষেত্র, গবাদিপশু ও মৎস্য চাষের ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি এনজিওগুলোও এদের পাশে এসে দাঁড়াবে, এটিই কাম্য। আর ঠিক দুয়েকদিনের মধ্যেই দেশজুড়ে পালিত হবে ঈদুল ফিতর। এটি মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। নব্বই শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশে এটি জাতীয় উৎসবও বটে। এ উৎসবে শরিক হয় সব সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে ঈদুল ফিতর হলো সিয়াম সাধকদের জন্য মহান আল্লাহর পুরস্কার। ঈদুল ফিতরের আনন্দ বিশেষভাবে আসে তাদের জন্যই যারা মাহে রমজানে আত্মশুদ্ধির শিক্ষায় নিজেদের আলোকিত করেন। শাব্দিক দিক থেকে ঈদের অর্থ বারবার ফিরে আসে এমন আনন্দ। আর ফিতর শব্দটির উৎপত্তি আরবি ফুতুর থেকে। যার অর্থ সকাল বেলার নাস্তা বা মূল্যবান পুরস্কার। রমজানে আল্লাহর যেসব বান্দা সিয়াম সাধনা করে শাওয়াল মাসের সূচনায় রোজা ভঙ্গ এবং ঈদের জামাতে হাজির হওয়াই হলো ইসলামী পরিভাষায় ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের সকালে বিশ্বাসী মানুষ ছুটে যান ঈদগাহে। ঈদের নামাজ শেষে তারা একে-অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। মুমিনদের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে ঈদগাহের এই মিলনমেলা। মানুষ উৎসবী পরিবেশ ও পরিুছন্ন মন-মানসিকতা দিয়ে একে-অপরের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পবিত্র জীবনযাপন করবে আল্লাহ তেমনটিই চান। এ উৎসবে সমাজের ধনী-গরিব-নির্বিশেষে সব বিশ্বাসী মানুষ যাতে অংশ নিতে পারে, সে জন্য রয়েছে আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধান। এ জন্যই সদকাতুল ফিতর আদায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাহে রমজানের মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা মানুষকে যেমন ত্যাগের শিক্ষা দেয়, তেমনি ঈদ উৎসবকে ধনী-নির্ধন-নির্বিশেষে আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশীদের মধ্যে ভাগাভাগির তাগিদ দেয়।


তবে এ বছরের ঈদ একেবারেই ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপটে পালিত হতে যাচ্ছে। এই বিশেষ সংখ্যা যখন প্রস্তুত হচ্ছে তখন, গোটা বিশ্ব লড়ছে করোনাভাইরাসের সঙ্গে। বাংলাদেশেও চলছে লকডাউন। এমন পরিস্থিতিতে মাহে রমজানের তারাবিও আদায় হচ্ছে সীমিত পরিসরে। ঈদের জামাতের ব্যাপারেও আছে বিধি নিষেধ। অনেক নিম্ন আয়ের ও মেহনতি মানুষ রয়েছে অনাহারে অর্ধাহারে। ঈদ ও রমজানের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সবারই উচিত উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়া। আমরা আশা করবো ঈদের আগেই আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন করোনা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করে দেবেন। এরপরও আল্লাহ না করুক যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তাহলে আমাদের উচিত সরকারি বিধি নিষেধ মেনে উৎসবে শামিল হওয়া। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন সমগ্র মানবজাতিকে এই মহামারির কবল থেকে রক্ষা করুন। আর আমাদেরকে এই শোক-শঙ্কা-মুসিবত কাটিয়ে ওঠার তৌফিক দিন।
সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।
ঈদ মোবারক।

মেহেদী হাসান বাবু
সম্পাদক ও প্রকাশক
আজকের বিজনেস বাংলাদেশ

এ বিভাগের আরও সংবাদ