ঢাকা সকাল ১০:৩০, মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২০ ইং, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

উচ্চশিক্ষার বাসনা ও বেকারত্ব

বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হলো মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করা। মানুষ নিজে নিজে তো মুক্তি অর্জন করতে পারবে না; বরং অন্যের মুক্তির উপর মানুষের মুক্তি নির্ভরশীল। হোক সে মানুষের বা প্রকৃতির ক্ষুদ্র কোনো উপাদানের।
মনো-বিশ্লষণের আঙ্গিক থেকে যদি প্রশ্ন করা হয়, মানুষ আসলে কী চায়? একটু সহজ করে বলা যাক, আমি কী চাই? এই সমাজে আমি যা চাই তা কি সত্যিই আমি চাই? নাকি আমাকে চাওয়ানো হয়? ধরা যাক, ডাক্তার প্রকৌশলী বা ক্যাডার হতে চাওয়া দৃশ্যত আমার স্বপ্ন। অথচ সমাজ,পরিবার,গণমাধ্যম,শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান,ধর্মীয়-প্রতিষ্ঠান,রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্র তাদের স্বপ্নগুলোকে আমার ভেতর বুনে দেয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়- আমি চিনতেও পারিনা যে, এই স্বপ্নগুলো আমার না।
প্রকৃতপক্ষে, মানুষের যে মৌলিক চাওয়া তা হলো, মুক্তির চাওয়া। সে চাওয়ার মধ্যে রয়েছে-
(ক) বিশুদ্ধ অবসর পাওয়ার আকাক্সক্ষা।
(খ) সমাজের অসঙ্গতিগুলো বদলে দেবার ইচ্ছা।
(গ) প্রকৃতির মধ্যে আধ্যাত্মিকতার বোধে নিজেকে হারিয়ে ফেলা।
(ঘ) প্রচণ্ড রকমের সৃষ্টিশীল হতে চাওয়া।
(ঙ) নিজেকে নানান প্রাণের সাথে যুক্ত করা।

এরকম অসংখ্য চাওয়া রয়েছে মানুষের।কিন্তু এই চাওয়াগুলোকে আমরা প্রচলিত পড়াশোনার চাপে একেবারে কোনঠাসা করে দিয়েছি। পড়াশোনা এখন হয়েছে একধরনের ফরমায়েশি কাজ। এই পড়াশোনা দিয়ে যেন কেরানি হয়ে ওঠা যায়, বা অন্যের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করা যায় তাই এখন প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের জীবন-বিচ্ছিন্ন পড়াশোনার মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতে যেতে আমাদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষাগুলোকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো সেই স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষাগুলোকে জাগ্রত করা।
অধ্যাপক প্রভাত পাটনায়েকের মতে- “বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চিন্তাহীনতা একটি দুর্নীতি।” সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যারা যুক্ত তারা যদি কোনোভাবে চিন্তাহীন, ফরমায়েশি, জান্তব বা যান্ত্রিকতার মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চায়, তাহলে প্রভাত পাটনায়েকের সূত্র ধরে এটাকে একধরণের দুর্নীতি বলা হবে।তাই বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে হবে, প্রবল প্রশ্ন ছুঁড়তে হবে। আর অবসরে জটিল প্রশ্নগুলোর সমাধান খুঁজতে হবে।
বিশ্বিবদ্যালয়ের পাঠ পদ্ধতি সম্পর্কে নোম চমোস্কি বলেছেন- “ঊফঁপধঃরড়হ রং ঃড় ফরংপড়াবৎ হড়ঃ ঃড় পড়াবৎ” অথচ দেখুন,আমাদের দেশের মূল শিক্ষা ব্যবস্থায় কিন্তু ফরংপড়াবৎ ব্যাপারটা নেই। আমাদেরকে ব্যস্ত করে রাখা হয় সিলেবাস শেষ করে পরীক্ষায় বসার জন্য। সার্টিফিকেট হাতে দিয়ে সংবর্ধনা দেয়া হয় প্রবল উদযাপনের মাধ্যমে।
অথচ, দিনশেষে আমরা নিজেরাই ঠিক করতে পারছি না আসলে আমরা শিখলামটা কি! শুধু এই কারণেই বর্তমানের তরুণ সমাজ ভীষণ রকমের বেপরোয়া হয়ে উঠছে। প্রচণ্ড রকমের অসহিষ্ণু আর অস্থির হয়ে পড়েছে। কাউকে সে মান্য করেনা, বিবেচনাও করেনা। স্নেহ সম্মান একেবারেই অনুপস্থিত। অবক্ষয় হয়েছে মানবিক ও কল্যাণকর সামাজিক মূল্যবোধের।
এই বেপরোয়া তরুণদের একটি বিরাট অংশ কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে শিক্ষা লাভ করছে। তারপরেও এই অবস্থা কেন?এই অবস্থা এই জন্যে যে, একদিকে শিক্ষার্থীরা যা পড়ছে সে পড়ার সাথে জীবনের নিবিড় সুর ও একাত্মতা সৃষ্টি করতে পারছে না।অন্যদিকে,(অধিকাংশ) শিক্ষক ক্লাসে গিয়ে শুধু ঝুষষধনঁং পড়াবৎ করতে ব্যস্ত উরংপড়াবৎ এ না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো উরংপড়াবৎ করা, প্রশ্ন করতে শেখানো এবং প্রাচুর্যময় সম্পূর্ণ মানুষ বিনির্মাণে গভীর অবদান রাখা।বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা নয়। উচ্চশিক্ষার প্রধান উপজাত হিসেবেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাবার কথা ছিলো। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরে এসেও তা হলো না কেন?
কর্মসংস্থানের কথা বলতে গেলে- এই মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে পরিকল্পিতভাবেই উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরি করা হয়। দেশে এখন বেকারের সংখ্যা ৫ কোটির কাছাকাছি। তার মধ্যে উচ্চ শিক্ষিত বেকার রয়েছে প্রায় দুই কোটির মত। যোগ্য স্নাতকরাও চাকুরির জন্য বছরের পর বছর বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। কর্মসংস্থান জোটাতে না পারলে ব্যক্তি নিজের যোগ্যতা ও ভাগ্যের দোষ দিতে থাকে। ব্যাপারটা এতটা নিরীহ নয়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ইত্যাদির প্রভাবে বড় বড় দেশীয় ও বহুজাতিক ব্যবসায়ীদেরকে কোটি কোটি ডলার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রনোদনা দিতে হয় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। তার সাথে আমাদের মত দক্ষিণের দেশগুলোর রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি ও অবিকশিত গণতন্ত্র। ব্যাংক লুট, বিদেশে টাকা পাচার ইত্যাদির দায় সরকারই নিজেদের কাধে তুলে নেয়।জনগণের করের টাকায় খেশারত দেয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রচুর আর্থিক বিনিয়োগ ও বৃহত বাণিজ্যের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ, জীবাশ্ম জ্বালানীতে ভর্তুকি ইত্যাদি কারণে সরকারগুলো সামাজিক নিরাপত্তা (সোশ্যাল সেফটি)দিতে পারে না। এছাড়াও কর্মসংস্থানের উপযোগী শিক্ষা-প্রশিক্ষণে প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সেই তিমিরেই পড়ে থাকে সব।
আগেই বলেছি,মানুষ হিসেবে প্রাচুর্যময় সামগ্রিক বিকাশের কথা। একমাত্রিক ও বিশেষায়িত শিক্ষা দিয়ে তা সম্ভবপর নয়। জীবনের সাথে মিলিয়ে পাঠ্য বিষয়ের আন্তঃশাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ দরকার।অথচ লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে পরিবেশবিদ্যা অর্থাৎ প্রতিবেশ সংক্রান্ত পাঠের কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃতিকে দেখা হয় ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। একে জয় করার, এর উপর আধিপত্য ফলানোর চেষ্টা শুধু।এছাড়াও শিক্ষাব্যবস্থায় সবার জন্য নেই অর্থনীতির পাঠ ও রাজনীতি শিক্ষার সুযোগ। অর্থনীতিটাকে আমাদের কাছে অত্যন্ত কঠিন করে তোলা হয়েছে। আবার শিক্ষার্থীরা জানেই না যে, পরিবেশবিদ্যা একটি পাঠের বিষয়। ঘৃণা করে রাজনীতিকে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকশিত শিক্ষার্থী যদি রাজনীতিকে ঘৃণা করে তাহলে আগামীদিনে এই পৃথিবীর নেতৃত্ব দেবে কারা? এতদিন নেতৃত্ব যাদের হাতে ছিল তারাই তো এ নৃশংস ও দানবীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলন করে আমাদেরকে এই করোনা সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অতএব, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল উন্নত জাতি গঠন সম্ভব হবে। কারণ আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ই সমাজের আরোগ্য নিকেতন। নীতি নির্ধারকদের পক্ষ থেকে একটু সদিচ্ছার প্রয়োজন মাত্র।
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

বিজনেস বাংলাদেশ / আতিক

এ বিভাগের আরও সংবাদ