আজ মঙ্গলবার | ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ইং
| ৩০ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৫ সফর, ১৪৪১ হিজরী | সময় : সকাল ৯:২৭

মেনু

ব্যাংকে চাকরির নামে  “ডিজিটাল” জালিয়াতি

ব্যাংকে চাকরির নামে “ডিজিটাল” জালিয়াতি

শাহ আলম, বিশেষ প্রতিনিধি:
শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
৬:৫২ অপরাহ্ণ
45786 বার

সদ্য ডিগ্রি পাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্চারাম উপজেলার তাইজুল ইসলাম। অনেক চাকরিতে চেষ্টাও করেছেন তিনি। কিন্তু কিছুতেই চাকরি হচ্ছিল না তার। এমন সময়ে প্রস্তাব পেলেন, টাকা দিলেই মিলবে সরকারি ব্যাংকে চাকরি। আর টাকার পরিমাণটা ভালো হলে মিলবে ভালো বেতনের পদও। তখন তাইজুল যেন খোঁজ পেলেন সোনার হরিণের।
জেলার বড় ভাই কাওসার আলম লিটনের (৪৫) কাছ থেকে এমন প্রস্তাবের পর মোটা অংকের টাকা দেন। ‘নিয়োগও’ হয়ে যায় তাইজুলের। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের লোগো ও অন্যান্য আর্টিকেল থাকা একটি ওয়েবসাইটে নিজের নাম দেখেন তাইজুল। খুশিতে আপ্লুত হয়ে যান তিনি।
চাকরিতে যোগদানের একদিন আগে ঢাকায় আসেন তাইজুল। মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ব্যাংকের কোনো পদেই তাকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। শুনেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে তার।
তাইজুল বুঝতে পারেন ভুয়া ওয়েবসাইটে নিজের নাম দেখেছেন তিনি। ওইদিনই তিনি ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। বিষয়টি জানার পর ব্যাংকটির চিফ সিকিউরিটি অফিসার মেজর (অব.) মোজাম্মেল হক গত ১০ আগস্ট প্রতারক লিটনের নামে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেন।

তদন্তে নেমে পুলিশ দেখতে পায়, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের ভুয়া ওয়েবসাইট বানিয়ে চাকরি দেয়ার নাম করে একটি চক্র তাইজুলসহ অনেকের কাছে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা।
সোনালী ব্যাংকের মামলার পরই সেই লিটনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। লিটন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের মৃত এম এ মালেকের ছেলে। ঢাকা তিনি থাকতেন উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাসায়।
মামলার পর নড়েচড়ে বসেন সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তারা। তারা ব্যাংকটির আইটি বিশেষজ্ঞ দিয়ে অনুসন্ধান করে ব্যাংকের নামে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরির কারিগর মাহমুদুল হক মিঠুনের সন্ধান পান। এরপর একই ব্যাংকের এজিএম (এসিটেন্ট জেনারেল ম্যানেজার) গত ২৮ আগস্ট মিঠুনের নামে মতিঝিল থানায় আরকটি মামলা করেন।
এই মামলার তদন্তের ভার পায় সিআইডি। সিআইডি তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পরই বেরিয়ে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলার সূত্র ধরেই ২০ নভেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকা থেকে মিঠুনকে গ্রেফতার করা হয়।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, মিঠুন পেশায় একজন প্রকৌশলী। পড়ালেখা করেছেন রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর তিনি এফএনবিডি নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন চাকরির পর চলে যান কাওরানবাজারের জনতা টাওয়ারের ন্যানোটেক সলিউশন এ্যান্ড কনসালটেশন নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ন্যানোটেকে যোগদানের পর ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত চাকরি করেছেন। চাকরির সময় তিনি প্রতারক চক্রের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সরকারি ব্যাংক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নামে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরির কাজ করেন। সম্প্রতি মিঠুনের সর্বশেষ কর্মস্থল ন্যানোটেকে ব্যবহৃত তার কম্পিউটার থেকে ভুয়া ওয়েবসাইট বানানোর বিভিন্ন ডকুমেন্ট ও হার্ডডিস্ক সংগ্রহ করা হয়েছে।
জানা গেছে, মিঠুন প্রতি ওয়েবসাইট বানানো বাবদ পেতেন মাত্র ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে যার মাধ্যমে তিনি কাজটি পেতেন তাকে দিতে হতো দুই হাজার টাকা। এছাড়াও তার প্রতি সাইট তৈরির জন্য তিনি মাত্র দুই থেকে তিন ঘন্টা সময় নিতেন। সব কাজ অফিস ও বাসায় বসে করতেন।

সিআইডির একজন কর্মকর্তা জানান, চক্রটি বেশ বড়। লিটন মূলত বিভিন্ন শহর ও গ্রাম থেকে গ্রাহক সংগ্রহ করতেন, আর মিঠুন করতেন ওয়েবসাইট তৈরির কাজ। চক্রটি চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিজিটাল প্রতারণার কাজটি শুরু করেছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু গ্রাহক সংগ্রহ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। লিটন গ্রাহক সংগ্রহের পর তাকে চাকরি দেয়ার প্রমাণ স্বরুপ ওয়েবের ঠিকানায় ঢুকে ওই ব্যক্তির নিজের নাম দেখতে বলতেন। পরে চাকরি চূড়ান্ত হয়েছে জানিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতেন। তবে লিটন ও মিঠুনকে এসব কাজে কারা নিয়োগ দিয়েছিল তা খুঁজতে মাঠে নেমেছে সিআইডির বিশেষ গোয়েন্দা টিম।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ওয়েবসাইটগুলো এমন নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে তা দেখে সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। কারণ সরকারি ওই তিন ব্যাংকের সাইটে থাকা প্রতি আর্টিকেল সেখানে কপি করে রাখা হয়েছে। মানুষের বিশ্বাস জন্মানোর জন্য দেওয়া হয়েছিল ওই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ব্যক্তিদের নাম ও ছবি। ফলে সহজে সাইটগুলো দেখে বিশ্বাস করতেন এবং তাদের কাছে চাকরি নেয়ার জন্য টাকাও দিতেন।
এই সাইটগুলো দেখভাল করত রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ইকরা নামের একটি আইটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি এসব সাইট ভুয়া জেনেও তথ্য গোপন করেছিল কিনা তা খতিয়ে দেখছে সিআইডি।
এদিকে আদালতের একটি সূত্র জানিয়েছে, লিটন বর্তমানে জামিনে আছেন। গত ২২ নভেম্বর তার হাজিরা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আদালতে হাজির হননি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এএসআই কামাল হোসেন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ওয়েবসাইট বানানোর কারিগর মিঠুন জানতেন এসব সাইট ভুয়া। তারপরও তিনি সাইটগুলো তৈরি করেছিলেন। তবে তাকে গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।’
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে চক্রটি চাকরি দেয়ার প্রতারণা করে আসছিল। এর সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করার জন্য আমরা কাজ করছি।’

রাজধানীতে ২ ডাকাত আটক
১১ নভেম্বর ২০১৭ 59934 বার