আজ মঙ্গলবার | ২০ আগস্ট, ২০১৯ ইং
| ৫ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৮ জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী | সময় : রাত ৮:১৭

মেনু

ডেঙ্গু : গুজব না গজব?

ডেঙ্গু : গুজব না গজব?

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
শুক্রবার, ০৯ আগস্ট ২০১৯
২:২৭ অপরাহ্ণ
32 বার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন সিনিয়র বড় ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডায় প্রসঙ্গক্রমে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি স্থান পায়। তাদের পেশায় একজন আইনজীবী, অন্যজন সাংবাদিক। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তাই তাদের বেশ ভালা জানা আছে। কৌতুকের ছলে আইনজীবী বড় ভাইকে বলেছিলাম, দেশ যখন অস্থির হয়, তখন আইনজীবীদের পোয়াবারো। মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে তাদের আয়ও বেড়ে যায়। তিনি আমার এই বক্তব্য এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, দেশে যখন শান্তি থাকে, আইনের শাসন থাকে, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা থাকে, সেই সময়ই আইন পেশার সুসময়। এই কারণে বাংলাদেশের চেয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার আইনজীবীদের আয় বেশী।

ওই আইনজীবী আরও বলেন, বাংলাদেশের বিচারকদের দুটি মিথ্যা থেকে সত্যকে বের করতে হয়। কারণ অধিকাংশ মামলাই অন্যকে হয়রানি করতে করা হয়। সত্য সেখানে সুদূর পরাহত। সেই কারণে অনেকে সত্য ঘটনা নিয়েও অনেক সময় আদালতে বিচার প্রার্থী হয় না। মিথ্যার ভিড়ে সত্য এখানে সব সময় জড়সড়। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বে দুই সত্যের মধ্যে অধিকতর সত্য খুঁজে বের করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়। ফলে সহজে মানুষ বিচারপ্রার্থী হয়। আইনের শাসন থাকায় আইনজীবীরা তাই আনন্দচিত্তে সত্যের পক্ষে লড়তে পারে।

ইউরোপের বিচার ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে ওই আইনজীবী বলছিলেন, ইউরোপের আইনজীবীদের আয় বাংলাদেশের আইনজীবীদের থেকে বেশি। কারণ সেখানে ন্যায়বিচার থাকায় মানুষ নাগরিক অধিকারের অনেক ছোটখাট বিষয় নিয়েও আদালতের দারস্থ হয়। অভিজ্ঞতা থেকে বলছিলেন, ইউরোপের এক ভদ্রমহিলা ম্যাকডোনাল্ডের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। কারণ ম্যাকডোনাল্ড থেকে কেনা কফি পড়ে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনায় অবশ্যই ম্যাকডোনাল্ডের ওই অর্থে দায় ছিল না। কারণ ম্যাকডোনাল্ডের কেউ ওই ভদ্রমহিলার ওপর গরম কফি ফেলে তাকে পুড়িয়ে দেয়নি। বরং ভদ্রমহিলার অসর্তকতার কারণে নিজের হাত থেকে কফি পড়ে গিয়েই তার শরীর পুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওই ভদ্রমহিলা দাবি করেছিলেন, ওই দায় ম্যাকডোনাল্ডের। তার যুক্তি ছিল, ম্যাকডোনাল্ড থেকে তাকে সাধারণ তাপমাত্রার চেয়ে বেশি গরম কফি দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয়, কফি কাপের উপর ঢাকনা থাকার কথা থাকলেও তাকে দেওয়া কফির কাপে ঢাকনা ছিল না। ফলে তার হাত থেকে যখন কফি পড়ে যায় তখন ওই দুটি কারণেই তার স্কিন পুড়ে যায়। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে ম্যাকডোনাল্ড কর্তৃপক্ষকে ভদ্রমহিলাকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ প্রদান করে।

ওই ঘটনা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিক ভাই বলছিলেন, যেদেশে মানুষের জীবনের মূল্য নেই। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে। এক প্যাকেট সিগারেটের বিনিময়ে মানুষ হত্যার নজির আছে। ফাঁসির আসামি রাজনৈতিক বিবেচনায় মাফ পেয়ে যায়, সেই দেশে স্কিন পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়া অকল্পনীয়।

সাংবাদিক ভাইয়ের বক্তব্য মিথ্যা নয়। এ দেশে মানুষের জীবনের মূল্য কচু পাতার চেয়েও সস্তা। যে যেভাবে পারছে সাধারণত মানুষকে পিষে মারছে। কচু কাটা করছে। আর সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনেকের মৃত্যু ঘটছে। যে-যত কথাই বলুক, এই হত্যাকাণ্ডের দায় অবশ্যই সিটি করপোরেশনের দুই মেয়রের। তাদের দায়িত্ব অবহেলার কারণেই অনেক মানুষের প্রাণ অকালে ঝরে গেল।

উন্নত বিশ্বের কোনো দেশ হলে এসব মানুষের জীবন হারানোর জন্য দায়ী মেয়রদের এতদিনে জেলের ভাত খেতে হতো। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই হত্যাকারীরা দোর্দাণ্ড প্রতাপে আমাদের আজও শাসন করছে। ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, প্রতিদিন ডেঙ্গু দমনের নামে রঙ্গরস করছে তারা। নির্লজ্জের মতো গণমাধ্যমে লম্বা লম্বা জামা-পাজামা পরার সবক দিচ্ছে। মানুষের মৃত্যুকে গুজব বলে চালিয়ে দিচ্ছে।

এক সিটি মেয়র তো ডেঙ্গু দমনে ধর্মকে টেনে এনেছেন। যদিও ইসলাম ধর্ম অনুসারে ওই মেয়রের উচিত ছিল, নাগরিকদের ডেঙ্গু থেকে রক্ষা না করতে পারার ব্যর্থতার কারণে করের টাকা ফেরত দেওয়া। ইসলামের ইতিহাসে বহু উদাহরণ আছে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারার কারণে শাসক করের অর্থ ফেরত দিয়েছেন। কিন্তু সেই রামও নেই, অযোধ্যাও নেই।

দুই.

অবশ্য বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য আমি সরকার বা মেয়রের চেয়ে সাধারণ মানুষকে বেশি দায়ী করতে চাই। কারণ তাদের নির্লিপ্তার কারণেই একের পর এক অন্যায় ঘটে যাচ্ছে। আজ প্রথম মেয়র নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি এমন নয়। ডেঙ্গু মহামারির আগেই বা কতটুকু নাগরিক অধিকার নিশ্চত করেছিল? জনগণ কি তা জানতে চেয়েছে কোনো দিন? যদি জানতে চাইতো তাহলে আজ আর ডেঙ্গুতে প্রাণ হারাতে হতো না। মাসের পর মাস হাসপাতালকে ঘরবাড়ি বানিয়ে বাস করতে হতো না।

কিন্তু কী আর করা! চোখের সামনে শত শত অন্যায় দেখেও গা-বাঁচানোর কসরত করা বাঙালি জাতির মতো কোনো জাতি এই দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ধুকে ধুকে মরছে। বাংলাদেশ না হয়ে অন্যকোনো দেশ হলে বহু আগেই লংকাকাণ্ড ঘটে যেত। মেয়রের পদত্যাগের দাবিতে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নামত। জনরোষে মেয়র পদত্যাগ করতে বাধ্য হতো। কিন্তু এত প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরও মানুষের মাধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। চাচা আপণপ্রাণ বাঁচা অবস্থা। তাই সবকিছু দেখেশুনে মনে হয়, এ দেশের সাধারণত মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যই স্বাভাবিক! এডিশ মশার কামড় তাদের প্রাপ্য! প্রকৃতির তরফ থেকে সাধারণত মানুষের জন্য এটা শাস্তি। চোখের সামনে শত শত অন্যায় দেখার পরও যখন সে প্রতিবাদ করে না। এমন শাস্তি তার প্রাপ্ত।

যুগেযুগে শাসকরা যখন অন্যায় করেছে, প্রকৃতির তরফ থেকে তারা শাস্তি পেয়েছে। মশার কামড়ের নমরুদের সেই যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর উদাহরণ সবার জানা। কিন্তু আজ মশা শাসকগোষ্ঠীকে আক্রমণ করেনি। আক্রান্ত সাধারণত মানুষ। তাই সব দেখে-শুনে মনে হয়, গজব সাধারণত মানুষের জন্য নাজিল হয়েছে। সাধারণত মানুষ চোখের সামনে শত শত অন্যায় দেখার পরও প্রতিবাদ না করার শাস্তি পাচ্ছে। আজ যারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে এরা এত সাধারণ যে কখনও এরা বা এদের পরিবারের সদস্যরা অন্যায়ের প্রতিবাদে রাজপথে নামেনি। সবসময় নিজের ভালোমন্দ নিয়ে থেকেছে। গা-বাঁচিয়ে চলেছে। অবশ্য ব্যতিক্রম কিছু আছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় না।

মনে রাখা দরকার, দুনিয়ায় কোনো শাসকই জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করে না। যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণ সেই শাসকের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে না পেরেছে। শাসক জনগণকে যখন ভয় করেছে, তখনই সুশাসন নিশ্চিত হয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না, বাচ্চা কান্না না করলে মা দুধ দেয় না। তাই শাসক গোষ্ঠী ততদিন বদলাবে না, যতদিন এ দেশের জনগণ বদলাবে না। ডেঙ্গু বা অন্যকোনো মহামারিতে অকালে প্রাণ উৎসর্গ না করতে চাইলে, জনগণকে সবার আগে তাই বদলাতে হবে। জাগতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে।

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বিজনেস বাংলাদেশ-/এমএ