আজ সোমবার | ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ইং
| ৬ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২০ সফর, ১৪৪১ হিজরী | সময় : রাত ১:২৭

মেনু

টাকের যন্ত্রণা থেকে যেভাবে রক্ষা পেলেন নারী

টাকের যন্ত্রণা থেকে যেভাবে রক্ষা পেলেন নারী

ফিচার ডেস্ক
শুক্রবার, ৩০ আগস্ট ২০১৯
১:৫২ অপরাহ্ণ
67 বার

 

বিশ্ব জুড়ে প্রায় ১৪ কোটির বেশি মানুষের পূর্ণ অথবা আংশিক টাক রয়েছে। ইংরেজিতে যার নাম অ্যালোপেসিয়া। এই সমস্যা যাদের হয় তাদের মাথা বা শরীর থেকে চুল কমতে শুরু করে। অনেকের মাথা থেকে সব চুল পড়ে যায়। আবার ভুরু বা চোখের পাপড়িও পড়ে যায়। এমনকি অনেক অল্প বয়সেও এ ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন কেউ কেউ। তো এই রকমই সমস্যায় পড়েছিলেন লিলিয়া।

তার পুরো নাম লিলিয়া কুকুশকিনা-নুগমানোভা। মাথায় চুল না থাকার কারণে স্কুলে নানারকম বিদ্রূপের শিকার হতে হতো এই রাশানকে। অনেকে তো তাকে দেখে মনে করতেন, তার বুঝি ক্যানসার হয়েছে এবং ক’দিন পরেই মারা যাচ্ছেন তিনি। তাই জনে জনে তাকে বোঝাতে হতো: ‘না আমার ক্যানসার হয়নি। আমি মারা যাচ্ছি না। আর এটা ছোঁয়াচেও নয়।’

লিলিয়া এখন ২৮ বছরের তরুণী। কিন্তু কিশোরী বয়সে পৌঁছানোর আগেই তার মাথা চুল-শূন্য হয়ে পড়েছিলো। তাই স্কুলে তাকে প্রচুর বাজে অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হতে হয়েছিলো। তিনি বুঝতেও পারেননি যে, তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা। তবে সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো সতের বছর বয়সে। তাদের স্কুলে ছেলেদের একটা দল ছিল। তাদের সঙ্গে লিলিয়া বেশি মিশতেন না। তাই তারা সামাজিক মাধ্যমে একটি গ্রুপ তৈরি করে এবং তার নাম দেয়, ‘মিস নুগমানোভা একটা নেড়া কুকুর।’

পরচুলা মাথায় লিলিয়া

এতে লিলিয়া খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি এই কষ্ট থেকে বেরিয়ে আসেন। যদিও লিলিয়া স্বীকার করেন যে, তার মাথায় চুল না থাকার বিষয়টি মেনে নেয়া তার জন্য আসলেই কঠিন ছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি ওই সামাজিক প্রতিবন্ধকতা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এতে তার সাহসিকতারই জয় হয়েছে।

এই ব্যাপারটি মেনে নেয়ার বিষয়ে লিলিয়া চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছায় এ বছরের শুরুর দিকে। এর আগে তিনি তার সামাজিক সংগ্রাম নিয়ে একটি লেখা লেখেন এবং কোন পরচুলা ছাড়াই ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করেন। ওই ছবিটি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে, যার সঙ্গে অনেক মানুষ তাদের টাক বা চুল পড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে মন্তব্য করতে থাকেন। এর আগ পর্যন্ত লিলিয়ার বন্ধু, সঙ্গী বা সহকর্মীদের অনেকেই কখনো তাকে পরচুলা ছাড়া দেখেননি। তার মাথায় যে চুল নেই, এই ব্যাপারটাই তো অনেকে জানতো না।

লিলিয়া বলেন, ‘আমার পরচুলা অনেকটা আমার প্রতিরক্ষার মতো কাজ করতো। কিন্তু এটা অনেক সীমাবদ্ধতাও তৈরি করেছিল। কিশোরী বয়সে আমি অনেক মজার কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারিনি, কারণ আমার ভয় হতো যে, পরচুলাটা হয়তো পড়ে যাবে। আমি রোলার কোস্টার থেকে দূরে থাকতাম, সাঁতার কাটা বা ডাইভিং করার মতো ব্যাপারে কখনো যাইনি। সেক্স নিয়েও আমার একই রকম আতঙ্ক ছিল।’

সেদিনগুলোতে নিজের মানসিক অবস্থা নিয়ে লিলিয়া বলেন, ‘ভেবে দেখুন, আপনার সঙ্গী জানেন না যে, আপনি পরচুলা পরে আছেন। আর যৌনমিলনের সময় সেটি খুলে পড়ে গেল…। আর এটা তার জন্য কতটা ভীতিকর হতে পারে।’

লিলিয়া এখনো মাঝেমধ্যে পরচুলা পড়েন। তবে প্রয়োজন ভেবে নয়, ফ্যাশন হিসাবে।

সেই সময়ের ভীতিকর অভিজ্ঞতা আর নিজের বোকামীর জন্য এখন আফসোস করেন লিলিয়া। তার ভাষায়, ‘আমি যদি আমার সেই কিশোরী বয়সে টাক মাথা বা পরচুলা নিয়ে চিন্তা বন্ধ করে আনন্দ করতে পারতাম!’

তবে লিলিয়া এটাও জানেন যে, যেসব মানুষ তাদের টাকের বিষয়কে উপেক্ষা করে আনন্দ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের অনেকে অনলাইন ও অফলাইনে নানা অপ্রীতিকর মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

‘অবশ্যই যেসব মানুষ টাক বিষয়টি সম্পর্কে জানে না, তারা হয়তো আমাকে দেখে ভয় পেতে পারে। অনেক সময় তারা নিষ্ঠুরও হয়। অথচ তারা তো বলতে পারতো- চুলসহ তোমাকে এতোটা ভালো লাগে না, বরং চুল ছাড়াই তোমাকে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।’

তবে সবকিছু মেনে নিয়েছেন লিলিয়া। তার ভাষায়, ‘যারা আমার প্রশংসা করতে চাননি বা পারেননি সেসব মানুষকে দোষ দিতে চাই না।’

এই বিষয়ে আরো ভালোভাবে জানা এবং এ ধরণের আরো মানুষজনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর লিলিয়া আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। লিলিয়া মনে করেন, এ নিয়ে মানুষের অযথা বিরূপতা দূর করতে হলে এই বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়া জরুরি। তিনি কখনো কখনো বন্ধু ও অপরিচিত মানুষের কাছ থেকেও এসব বিষয়ে প্রশ্ন শুনতে পান।

‘একবার খুব ছোট একটি শিশু আমাকে রাস্তায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে, কেন আমার মাথায় চুল নেই। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে, কীভাবে তাকে এটা ব্যাখ্যা করবো। সুতরাং আমি একটা তুলনা করার চেষ্টা করলাম যে, আমি হচ্ছি মানুষের মধ্যে লোমহীন বিড়াল।’

লিলিয়া মনে করেন, তার কোনো চুল নেই মানে এই নয় যে, অন্য সবার চেয়ে তিনি বেশি ভালো বা খারাপ।

এখন নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই টেকো মানুষদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন লিলিয়া। তিনি এজন্য অনলাইনে একটি সহায়তা গ্রুপের তৈরি করেছেন। যাদের কাজ হলো টাক সমস্যায় থাকা লোকদের নানা পরামর্শ ও সাহস দেয়া।

তিনি বলেন, ‘আমি জানি, যেসব শিশুদের টাক সমস্যা রয়েছে, তাদের বাবা-মা ভয় পান যে, তাদের মেয়েটির হয়তো বিয়ে হবে না বা ভালো চাকরি পাবে না। তারা ভয় পান যে, তাদের ছেলেটি হয়তো কটু মন্তব্যের শিকার হবে এবং নেতাদের মতো সম্মান পাবে না।’

এই আধুনিক যুগেও বিশ্বের কোথাও টাক পড়া বা চুল হারানোর তেমন কোনো কার্যকরী চিকিৎসারি কথা শোনা যায় না। তাই টাকে চুল গজানোর চটকদার বিজ্ঞাপনগুলো থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন লিলিয়া।

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় অভিভাবকরা টাক পড়া বন্ধ করার চেষ্টা করেন এবং এমন সব পদ্ধতি বেছে নেন, যা শুনলে আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আমার বাবা-মাও সেই চেষ্টা করেছিলেন। আমরা লেজার প্রক্রিয়া এবং মাথার খুলির চামড়া পুড়িয়ে দেয়ার মতো পদ্ধতি চেষ্টা করেছিলাম। আমরা হরমোন ইনজেকশন দিয়েছিলাম, যা শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব না করার জন্য আমি সবাইকে পরামর্শ দেবো।’

বরং এই শারীরিক সমস্যাটিকে মানিয়ে নেয়াই সবচেয়ে সহজ। আর এজন্যই এসব মানুষদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন লিলিয়া। তার এই সহায়তা গ্রুপের কাজ তার জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ব্যবস্থাপনা পেশা ছেড়ে তিনি এখন সামাজিক কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, ‘যখন আপনি টাক পড়া বা মাথায় চুল কম থাকা মানুষদের সঙ্গে মিশবেন, আপনি উপলব্ধি করবেন যে, এটার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার অনেক উপায় রয়েছে। সবচেয়ে জটিল ব্যাপারটি হলো, এটা আপনাকে একা একা করতে হবে না। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে একটি সহায়তা গ্রুপে অংশ নেয়া, যেখানকার মানুষরা এসব জটিলতা কাটিয়ে উঠেছেন। কাজেই তারাই আপনাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারবে এবং আপনাকে নানাভাবে সহায়তা করবে।’

আর এদের সাহায্য নিয়েই তো লিলিয়ান নিজের টাক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। বদলে ফেলতে পেরেছেন নিজের জীবন-দর্শন ও পেশা।

বিবিসি বাংলা অবলম্বনে

বিজনেস বাংলাদেশ-/এমএ

ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়ছে
০৫ অক্টোবর ২০১৭ 121297 বার

রাতে দেরি করে খেলেই বিপদ
১৪ অক্টোবর ২০১৭ 73750 বার